বৃষ্টি

image

লাল আকাশ। রাতের প্রথম প্রহর। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, সেজন্যেই তা লাল দেখাচ্ছে। দিনের বেলা হলে হয়ত এটি কালো দেখাত। মেঘাচ্ছন্ন রাতের আকাশ লাল দেখায়, তা এত বছর প্রত্যক্ষ করার পরেও এর যথার্থ কারণ খুঁজে পাইনি। খুঁজে পাইনি- বললে তা অসত্য হবে, বরং খোঁজার চেষ্টা করিনি।

বৃষ্টি শুরু হয়নি। তবে হব হব করছে। শরীর হতে ঘামের ফোঁটা ভূ-আকর্ষণের প্রভাবে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। বারবার তা মুছে ফেলাটাও বিরক্তের কাজ। গায়ে কোনো কাপড় নেই, তবুও ঘামছি। পরনের কাপড়ও বোধহয় ঘামে কিছুটা হলেও ভিজেছে। তবে আশার কথা, এখন কিছু বাতাস বইছে। ঘামে সিক্ত শরীরে বাতাস তার নরম পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, আর তাতে বারবার এ শরীর পুলকিত হচ্ছে।

বাতাসের ঘ্রাণেও রয়েছে বৈচিত্রতা। উষ্ণ আবহাওয়ার বাতাসের ঘ্রাণে কিছুটা তপ্তভাব রয়েছে। শীতের সময়ের বাতাসের ঘ্রাণ তো নাকেই নেয়া যায় না, এতটাই হিমভাব তাতে। বর্ষার কিংবা উষ্ণকালের ঝড়ের পূর্বে বয়ে যাওয়া বাতাসে এক আলাদা রকমের ঘ্রাণ রয়েছে। যে ঘ্রাণ বহন করে ঝড়ের কিংবা এক পশলা বৃষ্টির পূর্বাভাস। ঘ্রাণ পেয়েই বৃষ্টির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা মন আনন্দে নেচে ওঠে।

আমার মনও নেচে উঠেছে, বৃষ্টির ঘ্রাণ পেয়েছি। ঝড় হলে আমি ও আমার মন ততটা আনন্দ পাই না, যতটা পাই এক পশলা বৃষ্টি কিংবা মুষলধারে বৃষ্টির দেখা পেলে।

ঝড় হলে আনন্দ পাই না কেন- তা নিয়ে একটু চিন্তা করতেই উত্তর বের হয়ে এলো। ঝড়ের মধ্যে খানিকটা নির্মমতা রয়েছে। ঝড় মানেই বজ্রপাত। আর বজ্রপাত হলো নির্মমতার প্রতীক। নির্মমতা কিংবা উগ্রতাকে বুঝাতে তো ‘বজ্র’ শব্দটির ব্যবহারই দেখতে পাই। বজ্রপাত হলেই সেখানে কোনো না কোনো প্রাণের অস্তিত্বলোপ হবেই। তাছাড়া এটি কিছুটা আতঙ্কেরও সৃষ্টি করে অনেকের মনে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বজ্রপাতকে অপছন্দ করি। এর ভয়াবহ সাপের ফণাতুল্য ঝলকানি, এবং হৃদয়কাঁপানো আর্তনাদ, হুঙ্কার, গর্জন; যা-ই বলি না কেন, তা আমাকে আতঙ্কিত করে তোলে।

পক্ষান্তরে মুষলধারের বৃষ্টি আমার মনপ্রাণকে নরম, সুস্থির, এবং কিছুটা ভাবুক করে তোলে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার সাথে পুরনো দিনের কিছু আনন্দ-বেদনাময় ঘটনার কথাও মনে পড়ে যায়। মনে আসে শান্তি শান্তি ভাব। তখন মনে হয়, যেন বহুদিন পর এই ব্যস্ততার, অবহেলার, এবং কিছুটা নিস্প্রাণতার কশাঘাতে জর্জরিত এ মন অনেকখানি প্রশমিত হলো। বুক ভরে সেই বৃষ্টির শীতল বাতাস টেনে নিই, এবং মনের যত আগাছা, দুশ্চিন্তা,  তা নিঃশ্বাসের সাথে বের করে দিই। বুককে শূন্য করে দিই ভবিষ্যতের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্যে।

মেঘ ডেকে ওঠল। এর আগেও বারকয়েক ডেকেছে। এর মানে কী আশেপাশে কোথাও ঝড় হচ্ছে? হলেও হতে পারে। ধীরে ধীরে হয়ত তা এই এলাকার আকাশে এসে পড়বে। তুমুলভাবে – এবং হয়ত কিছুটা তাণ্ডব ঘটিয়ে, কয়েকটা গাছ কিংবা গাছের ডাল ভেঙে, তা চলে যাবে দক্ষিণের সমুদ্রে, কিংবা দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ী অঞ্চলগুলোতে, যেখানে জুমের চাষ হয়, এবং ফি-বছর পাহাড়ের ধ্বস নামে।

ঘরের বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। মানুষের এই আবিষ্কার এখনও স্রষ্টার সৃষ্টির কাছে দুর্বল, এবং হয়ত সামনেও এটি একইরকমই থেকে যাবে। হালকা বাতাসেই বিদ্যুত বিভাগের মানুষ ভয় পেয়ে যায়। দমকা বাতাসে তাদের তৈরি ট্রান্সমিটারগুলো মাঝে মাঝে মুখ থুবড়ে পড়ে। ঝড়ের আঁধারে ঢেকে যাওয়া শহরগুলো ঝড়ের বিদায়ের পরেও বিদ্যুতহীনতায় আঁধারেই ডুবে থাকে। কারিগরি যন্ত্রপাতির স্বল্পতায়, এবং তার সাথে জুড়ে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের অলসতায় হয়ত পুরো দিন বিদ্যুতহীনতায় ব্যাপক হীনমন্মতায় ভুগতে থাকে এলাকাবাসী।

তবে সেদিকে আমার দেখার প্রয়োজন নেই। আমি সংবাদপত্রে ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিভ্রান্ত এলাকাবাসী’ মর্মে প্রতিবেদন লিখতে বসিনি। আমি বসেছি বৃষ্টি নিয়ে দু-চারটা কথা লিখতে, যা আমার মনের ঝরণা বেয়ে বেয়ে হাতে পড়ছে, এবং তা বের হচ্ছে বর্ণ, বাক্য হয়ে। একে যদি কেউ ‘সাহিত্য’ বলে তো বলুক, কেউ ‘ভুগিজুগি’ বলে তো বলুক; আমি একে বলব আমার মনের কথাগুলোর কিছুটা অগোছালো প্রতিস্থাপন।

এ কী, বিদ্যুৎ চলে এলো! যার-তার সমালোচনা দেখি করাই যাবে না। এখন কি আমি বিদ্যুত বিভাগের পক্ষে দু-চার লাইন লিখবো? সেটা অন্যদিনের জন্যে মূলতবী থাকুক বরং।

এক ফোঁটা, দু’ফোঁটা, তিন ফোঁটা, শত ফোঁটা, সহস্র ফোঁটা, বৃষ্টি এলো চলে। পাশের টিনে আচ্ছাদিত দোকানের ওপর যেন সুরলহরী উপচে পড়ছে। মাথার উপরের ছাদ সিমেন্টে বাঁধানো, তাই সেই সুরলহরী কাছ থেকে উপভোগ করতে পারছি না।

সুরলহরীর তালে তালে বৃষ্টির ধারা টিন বেয়ে বেয়ে পড়তে লাগল। উঠোনের মাটি নরম থেকে নরম হতে লাগল। বাগানে লাগানো গাছগুলোর প্রতিটি পাতা বৃষ্টিধারায় ভিজে ভিজে যেন আরো সজীব হতে লাগল। কোথা থেকে এক কোলাব্যাঙ এসে ঝোঁপের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। নারিকেল গাছটি বাতাসের দোলায় দুলতে লাগল, আর তার লম্বা লম্বা কাঁটাতুল্য পাতাগুলো ঝিরিঝিরি শব্দ তুলে আবহটাকে কিঞ্চিৎ রহস্যময় করে তুলল।

উঠোনের কিছুটা নিচু জমি প্লাবিত হয়ে যেন ছোট একটি খালে পরিণত হল। বাতাসের বেগ কমে গেছে, তবে বৃষ্টির ধারা পূর্বের ন্যায়ই রয়েছে। তাই বা কম কী! ঝড় তো হচ্ছে না! স্রষ্টার কাছে সহস্র কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে কার্পণ্য করব না। ঝড় না হোক, অন্তত এই বৃষ্টি যেন কম পরিমাণে দীর্ঘক্ষণ ঝরতে থাকে। তাতে একঘেয়ে উত্তাপ তো হ্রাস পাবে!

কত কর্মব্যস্ত মানুষ আজ দিনের বেলায় ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল, ছাতা ছাড়াই। তারা আজ ভিজে ভিজে ঘরে ফিরবে। হাতে হয়ত বাজারের ব্যাগ কিংবা সকালের নাস্তার পাউরুটির প্যাকেট থাকবে- এবং তা থাকবে বৃষ্টিধারায় সিক্ত। আমার মত বেকার, একটি পরিবারে সারাদিন ঘরে বসে থাকা  ‘সচেতন’ সদস্যদের দায়িত্ব হবে সেই ব্যস্ত সদস্যটির হাতের ব্যাগটি নিয়ে নেয়া, এবং তার দিকে একটি তোয়ালে বাড়িয়ে দেয়া। পাছে তার ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে।
সেই আয় করা ব্যক্তিরা আজ অন্তত আরামে ঘুমুতে হলেও পারবে। বৃষ্টির ধারায়, তার পরশে, তার ছোঁয়ায়, তার যাদুতে আজকের পরিবেশ অনেকটা হিমশীতল। তাই বৈদ্যুতিক পাখার কোনো প্রয়োজনই হয়ত হবে না।

বৃষ্টির তীব্রতা কমতে কমতে শূন্যে এসে ঠেকেছে। আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আজ রাতে বৃষ্টি আর কাঁদবে না। হয়ত অন্য কোনো দিন কাঁদবে।আজ তার আর কান্নার প্রয়োজনও নেই। যথেষ্ট হয়েছে।

বৃষ্টি,  হে প্রিয়, তুমি দু-তিনদিন বাদে এসো। তুমি আমাদের এত প্রিয়, অথচ এত কম দেখা দাও কেন? আমাদের কি তোমার পছন্দ না!

এই ছেলেমানুষি প্রশ্নের যথার্থ উত্তর অন্যদের মত আমারও জানা আছে। তোমার,  এবং আমাদের সবার স্রষ্টা তো একজনই। আমরা যদি তাঁর যথাযথ আনুগত্য না করি, উলটো ‘তাঁর আনুগত্য করাকে নিজের দুর্বলতা’ বলে অহংকার করি, তবে তিনি কি সাধে আমাদের শান্তি দিবেন? কখনোই না। বরং আমার অপ্রিয় বজ্রপাত দিয়ে তিনি তাঁর অবাধ্যদের শাস্তি দিবেন। সেটা তো আমরা কখনোই চাই না।

বৃষ্টি শোনো, তোমার ও আমাদের উভয়ের স্রষ্টার কাছে আমি ও আমরা ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমাদের ক্ষমা করে দিন হে প্রভু। আমরা আপনার অনুগ্রহের অনেক অস্বীকার করেছি, এবং করছি। আমরা সামনে থেকে অস্বীকার করতে চাই না, বরং আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে চাই। আমাদের ভুলের জন্য অনুগ্রহপূর্বক আমাদের পাকড়াও করবেন না। আমরা এই স্বল্প মস্তিষ্ক দিয়ে আপনার অনুগ্রহকে হয়ত বুঝতে পারছি না, তাই আমাদের মস্তিষ্ককে কিছুটা খুলে দিন।
বৃষ্টির মত এমন আরো সহস্র প্রিয় বন্ধু আপনি আমাদের দান করেছেন। আমরা তাদের গুণে দেখতে অপারগ, তবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে নই। আমাদের সেই ক্ষমতা দিন। এ প্রার্থনা গ্রহণ করুন।

বৃষ্টি, বিদায়। আবার এসো তোমার স্রষ্টার নির্দেশমতে।

Advertisements

ভ্রান্তি

image


ল্যাপটপের পর্দায় ভাসছে ফেসবুকের হোম পেইজ। আজ সারাদিন এর মধ্যেই বুঁদ হয়ে ছিল এবং এখনও আছে ২১ বছর বয়েসী নাদিয়া। যতক্ষণ সে ঘরে থাকবে, ততক্ষণ ল্যাপটপের সামনে থেকে সে নড়বে।
তার মা রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। বরবটি কাটতে গিয়ে তাঁর ডান হাতের তর্জনী কেটে গিয়েছে। তিনি কেটে যাওয়া অংশ চেপে রেখেছেন। কোথাও কেটে গেলে তিনি খুব ভয় পান এবং তাঁর চোখে পানি এসে যায়। তিনি অনেক কষ্টে নাদিয়াকে ডাকছেন।

নাদিয়ার সেদিকে খেয়াল নেই। সে এখন কানে এয়ারফোন গুঁজে একটি ভিডিও দেখছে। রান্নাঘরে কি হচ্ছে না হচ্ছে, তা সে আগেও কখনও লক্ষ করেনি, আজও করছে না।

একটা সময় তার মা তার এই অলসতার সমালোচনা করতেন। আরো সমালোচনা করতেন সাংসারিক কাজকর্মে তাঁকে সহযোগিতা না করার বিষয়ে। এখন সেই সমালোচনার ইতি টেনেছেন তিনি নিজেই। যে সমালোচনা কোনো সমাধান বয়ে আনে না, তাকে দিনের পর দিন ব্যবহার করার চেয়ে বিশ্রাম দেয়াই ভালো।

নাদিয়া স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ছে ‘পদার্থবিজ্ঞান’ বিষয়টি নিয়ে। তাকে দিনের বেলায় খুব একটা পড়ালেখা করতে দেখা যায় না। তবে নিশাচর প্রাণীর মত রাতের বেলায় তার সমস্ত ইন্দ্রিয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে পড়ালেখায় তার মনোযোগ গড়ে তোলার জন্যে। এবং তাদের এ প্রচেষ্টা কখনও বিফলে যায়নি।
তবে নাদিয়ার একমাত্র ভাই নাদিমের ইন্দ্রিয়গুলো বোধহয় তাকে তেমন সহযোগিতা করে না। অথবা হতে পারে সে নিজের ইন্দ্রিয়গুলোর যথার্থ ব্যবহার সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই তার ইন্দ্রিয়গুলো দুর্বল, এবং সে দুর্বল তার পড়ালেখাতে।

নাদিম ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। মানবিক বিভাগে পড়ছে সে। ম্যাট্রিকে তার বিভাগ ছিল বিজ্ঞান, তবে রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি। তাই কলেজে ভর্তির প্রাক্কালে তার দূরদর্শী বড় বোন নাদিয়া তাকে বিভাগ পরিবর্তনের আদেশ দেয়,  এবং সেও তা মাথা পেতে নেয়।

নাদিম অবশ্য প্রায় সারাদিনই ঘরের বাহিরে থাকে। সকাল থেকে দুপুরে কলেজ, দুপুর থেকে সন্ধ্যাবেলা কোচিং সেন্টার। সে বাসায় ফেরে রাত সাড়ে আটটা-ন’টার দিকে। সন্ধ্যা থেকে রাতের এই সময় পর্যন্ত সে কোথায় থাকে, তা সঠিক জানে না নাদিয়া,  এবং তার বাবা-মাও।

নাদিয়া একদিন নাদিমকে জিগেস করেই ফেলেছিল যে সে এই সময়টাতে কোথায় থাকে। নাদিম জবাব দিতে চায়নি। এরপর বারকয়েক জিজ্ঞাসার পর নাদিম মুখ ফুটে বলল যে, সে কয়েকজন বন্ধু মিলে একত্রে পড়ালেখা করে, যাকে বলে ‘গ্রুপ স্টাডি’। নাদিয়ার কাছে বিষয়টি মিথ্যে বলে মনে হয়েছে। ‘গ্রুপ স্টাডি’ এমন কোনো গোপনীয় বিষয় নয় যা এভাবে চাপাচাপির পর ইতস্তত মুখে স্বীকার করে নেয়া লাগবে। তাছাড়া নাদিম আহামরি এমন কোনো ভাল ছাত্র নয়, যে সারাদিন কলেজ-কোচিং করে দিনশেষে ‘গ্রুপ স্টাডি’ করবে। তবে এমনও হতে পারে যে নাদিমের হয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। আগের সেই অমনোযোগী নাদিম বোধহয় আর নেই।

নাদিয়া এবার গান ছেড়ে দিয়ে তা শুনতে লাগল। তার মা এসে ভেজা চোখে স্যাভলন ও ব্যান্ড-এইড খুঁজতে লাগলেন। এবং নাদিয়ার দিকে এক তীক্ষ্ণ ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রান্নাঘরে ফিরে গেলেন।

নাদিম বাসায় ফিরল। রাত তখন আটটা। সে ব্যাগ কাঁধ থেকে নামিয়ে তা ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে রেখে ওয়াশরুমে ছুট দিল।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলে নাদিয়া তাকে ডেকে পাঠায়।
‘নাদু, কেমন চলছে তোদের গ্রুপ স্টাডি?’
নাদিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখে লেগে থাকা পানি মুছতে মুছতে বলল,
‘ভালো।’
নাদিয়া এবার শোয়াবস্থা থেকে বসতে বসতে বলল,
‘আর তোর কলেজের ক্লাস, কোচিং; এগুলো কেমন চলে?’
‘ভালোই চলছে। কলেজের ক্লাসের চেয়ে কোচিং-এর ক্লাসই এগিয়ে আছে। আমি বেশ উপভোগ করছি। ‘
‘তুই কী উপভোগ করছিস?!’
‘পড়ালেখার কথা বলছি আর কি। ‘
‘তুই আবার পড়ালেখা উপভোগ করতে পারিস নাকি?  হাহাহাহা।’
নাদিয়ার তাচ্ছিল্যভরা হাসিতে নাদিম বোধহয় আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তবুও মুখ ফুটে কিছু বলে না সে।
‘আপা, আর কিছু বলবে?’
‘হ্যাঁ বলব। তোদের বোর্ড পরীক্ষা কবে? ‘
‘আগামী বছরেই হবে। তারিখ-টারিখ জানা নেই। আগে তো সিলেকশন টেস্ট হোক।’
‘সিলেকশন টেস্টের প্রস্তুতি কেমন তোর?’
কিছুটা অনুচ্চ স্বরে নাদিম ইতিবাচক জবাব দিল।
‘আচ্ছা যা,  গ্রুপ স্টাডি করে তো টায়ার্ড হয়ে গেলি। ভাতটাত খেয়ে ঘুমা!’
নাদিম কিছু না বলে উঠে চলে গেল। এমনিতেও সে কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের, বোনের সাথেও সে তেমন সহজ নয়।
যেখানে অন্যান্য ভাইবোনেরা পিঠাপিঠি স্বভাবের, সেখানে নাদিম আর নাদিয়া যেন দু’প্রান্তের প্রাণী। নাদিয়াকে নাদিম কিছুটা সমীহ করেই চলে। নাদিয়ার কাছে ব্যাপারটা খারাপ লাগে না। বরং সে নিজেকে এর যোগ্যই বলে মনে করে।


নাদিয়া মাঝেমধ্যে চিন্তাভাবনা করে দেখে যে,  তার পারিবারিক জীবনটা প্রতিদিনই এমন একঘেয়েমিতার মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হয়। বিছানা ছেড়ে দেয়ার পর বিছানায় ফেরা পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা ঘটে না, যা উল্লেখের যোগ্য। তার মা সারাদিন গৃহস্থালির কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন, বাবা সকালে অফিসে গিয়ে রাতে ফেরেন, নাদিমও সারাদিন বাইরেই থাকে। যদিও ছুটির দিনগুলোতে মা ব্যতীত পরিবারের বাকি সদস্যদ্বয়ের সাথে তার বিশেষ কথাবার্তা হয় না। কিন্তু তাই বলে একটা ছুটির দিনের জন্যে সে বাকি ছয়দিন এই একঘেয়েমিতা সহ্য করে যাবে, তা তো হয় না। আদর্শ মেয়েদের সহ্যক্ষমতা থাকতে হয়। নাদিয়া নিজেকে আদর্শ মেয়ে বলে মনে করে না, তাই তার মধ্যে এই ক্ষমতা নেই।

বোধহয় অনেকদিন পর নাদিয়ার এই একঘেয়েমি পরিবারের রুটিনের মাঝে এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা তাকে চমৎকৃত হতে বাধ্য করল।


সেদিন সন্ধ্যা না হতেই নাদিম বাসায় ফিরে আসল। তবে অন্যান্য দিনের মত ডাইনিং টেবিলে ব্যাগ ফেলে না দিয়ে এবং ওয়াশরুমে ছুট না দিয়ে সে নাদিয়ার সামনে এসে বসল। কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল সে। কালো শরীর হতে চুইয়ে চুইয়ে ঘাম ঝরছে, চোখ দু’টো অবসাদে ভারী হয়ে আছে এবং ভয়ানক লাল দেখাচ্ছে।
সে কী মনে করে নিজের ব্যাগ খুলে নাদিয়ার বিছানায় রাখল আর উঠে গিয়ে পকেটের মোবাইল সেটটি সামনে থাকা টি-টেবিলের উপর রেখে দিয়ে নিজ রুমে খানিকটা টলতে টলতে ফিরে গেল।
নাদিয়া এতে কিছুটা অবাক হয়। সে কিছুই বুঝতে পারল না। প্রতিদিনকার সেই পুরনো দৃশ্যের সাথে এই দৃশ্য ঠিক মিলছে না। নাদিমের ব্যাগ ও মোবাইল সেট কেন সে নাদিয়ার রুমে রেখে গেছে,  তা বুঝা গেল না। নাদিয়া ব্যাপারটা খেয়াল করতেই কয়েকবার উচ্চস্বরে নাদিমকে ডাক দিল। কিন্তু নাদিমের রুম থেকে কোনো জবাব আসেনি।

নাদিয়া তার ছোট ভাইয়ের রুমে প্রবেশ করার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেনি। যার যা ইচ্ছা, তাই করুক। সে পা দিয়ে ঠেলে নাদিমের ব্যাগ বিছানা থেকে ফেলে দিল। তবে মোবাইল সেটটা তার নাগালের বাইরে বলে কিছু করতে পারেনি। নইলে হয়ত সেটাও ফেলে দিত টি-টেবিল থেকে।

সন্ধ্যা হয়েছিল ছয়টায়, দেখতে দেখতে সাড়ে ছয়টা বেজে গেল। এই আধা ঘণ্টায় নাদিম রুম থেকে বেরোয়নি। ঠিক দশ-পনের মিনিট বাদে টি-টেবিলের উপর রাখা নাদিমের মোবাইল সেটটি বেজে ওঠল। নাদিয়া সেটি ইচ্ছে করেই রিসিভ করল না। তার বিছানা ছেড়ে নামতেই মন চাচ্ছে না।
তবে মোবাইল সেটে আসা সেই ফোনকল একের পর এক বেজেই যাচ্ছিল। শেষমেশ নাদিয়া বিছানা ছেড়ে নামতে বাধ্য হল।

মোবাইলের পর্দায় ভাসছিল কয়েকটি অক্ষর, অনেকটা কোডের মত। তাতে লেখা ছিল, ‘S6’।  নাদিয়া বুঝতে পারল না এর মানে কী।
নাদিয়া ফোনকল রিসিভ করল,
‘হ্যালো, কে?’
একটি ছেলের কণ্ঠ শোনা গেল ওপাশ থেকে,
‘আসসালামু আলাইকুম। স্যার আছে?’
‘স্যার?!’
‘স্যার নাই?’
‘তুমি কে?  আর কার কাছে ফোন করেছ?’
‘আমার নাম হানিফ। আমি স্যারের কাছে ফোন করেছি।’
নাদিয়া ছেলেটির নির্বুদ্ধিতায় বিরক্ত হয়ে বলল,
‘তাতো বুঝলাম, কিন্তু তোমার স্যারের নাম কী?’
‘আপনি কে? ‘
‘ওমা, তুমি ফোন করবে,  আর আমাকে বলতে হবে আমি কে? আজব তো!’
‘আপনাকে আমি চিনি না, আমার স্যারকে দিন।’
নাদিয়া বুঝল ছেলেটির বুঝ কম। তাই সে তার কণ্ঠ ও কথা বলার ভঙ্গি যথাসম্ভব কোমল করে বলল,
‘ঠিক আছে ভাইয়া, আমি তোমার স্যারকে দিচ্ছি। কিন্তু তার আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো ভাইয়া।’
‘কী প্রশ্ন?’
‘এই তো গুড বয়। আমার প্রশ্নটা হলো, তোমার স্যারের নাম কী?’
‘আমার স্যারের নাম নাদিম। উনি আজকে আসেন নাই কেন এটা জানার জন্যে আম্মু ফোন করতে বলেছে, তাই করলাম।’
নাদিয়া ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তার ভাইয়ের যে কোনো ছাত্র থাকতে পারে, তা তার বোধের বাইরে ছিল। এর মানে কী দাঁড়ায়। এর মানে দাঁড়ায় যে নাদিম ট্যুইশনি করায়, তাও পরিবারের কাউকে না জানিয়ে।
‘হ্যালো…হ্যালো।’
‘ও হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি ভাইয়া।’
‘উনি আসেননাই কেন?’
নাদিয়া একটু ভেবে বলে,
‘ও একটু অসুস্থ, আজ মনে হয় যাবে না তোমাকে পড়াতে।’
‘অও, আচ্ছা। ঠিক আছে।’
‘তুমি কোন ক্লাসে পড় ভাইয়া?’
‘আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি।’
‘নাদিম স্যার তোমাকে কতদিন হলো পড়াচ্ছে?’
‘অনেকদিন! আমার ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা থেকে।’
‘অও আচ্ছা, রাখি তাহলে।’
‘আপনি কেন রাখবেন? আমি ফোন করেছি আমি রাখব…’
ছেলেটার কথা শেষ হওয়ার আগেই নাদিয়া নিজেই ফোনকল কেটে দেয়।

নাদিয়া বিছানার একপ্রান্তে বসে পড়ে। নাদিম ট্যুইশনি করাচ্ছে, অথচ বাসায় কাউকে বলেনি কেন? আর তার ট্যুইশনির প্রয়োজনই বা কেন পড়ছে? বাবা একটি ব্যাংকের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, তাতে যা আসে তা-ই কী অনেক বেশি নয়?  নাদিয়া আর নাদিমের জন্যে দু’দুটা ল্যাপটপ কিনে দিয়েছে তার বাবা বছরখানেক আগে, এর চেয়ে উৎকৃষ্ট আর কোন উদাহরণ দিলে তাদের স্বচ্ছলতা বুঝানো যাবে!
তারপরেও কীসে তাকে ট্যুইশনি করাতে বাধ্য করছে? নাদিয়া নিজে কখনো কারো ট্যুইশনি করেনি, দরকার পড়লে তো করবে।
এখন নাদিয়ার মাথায় ঘুরছে একটাই ব্যাপার। তা হল, নাদিম এই ট্যুইশনির টাকা কোথায় খরচ করে, এটা জানা। সে কী আবার বাজে অভ্যাস করেছে নাকি? তার বয়েসী ছেলেপুলে তো সিগারেটের অভ্যাস বাঁধাতে সময় নেয় না। আর তাছাড়া বন্ধুদের নিয়ে আড্ডাবাজি তো আছেই। নাদিয়ার কোনো আপত্তি হত না, যদি নাদিম ভালো ছাত্র হত। ভালো ছাত্র নয় বলেই যত আপত্তি।

একটা ব্যাপার নাদিয়ার কাছে স্পষ্ট হলো যে, সে ‘গ্রুপ স্টাডি’র নামে এতদিন ট্যুইশনি করিয়ে আসছিল। সে বিষয়টি গোপন রেখেছে। যে ছেলে একটি বিষয় গোপন রাখতে পারে, সে আরো কয়েকটি বিষয়ও গোপন রাখতে পারে। জেরা করে আজ তার অবস্থা কাহিল করে ফেলা হবে, নাদিয়া অন্তত তাই মনে করে।

বিছানা ছেড়ে সে উঠতে গেল। তখনই আবার নাদিমের মোবাইল বেজে উঠল। নাদিয়া হাতে নিল সেটি। আবারো আগের মত কোড অক্ষর, ‘NP’।  এটিও নিশ্চয় আরেকটি ছাত্র। কতজনকে পড়ায় সে,  কে জানে!
‘হ্যালো কে বলছেন?’
একটি বয়স্ক মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
‘আসসালামু আলাইকুম বোন, এটা কি নাজমুল হাসান নাদিমের ফোন নাম্বার?’
নাদিয়া জবাব দিতে একটু দেরি হয়। নাদিমের পুরোনাম সে ভুলেই গিয়েছিল।
‘জ্বি, এটা তার নাম্বার।’
‘উনাকে কি একটু দেয়া যাবে। একটু জরুরী কথা ছিল।’
একজন বয়স্ক লোকের মুখে নাদিমকে ‘উনি’ বলে সম্বোধন করতে শুনে নাদিয়া একটু অবাকই হল। তবে সে এটুকু বুঝতে পারল যে লোকটি নাদিমের কাছের কেউ নয়।
‘কী কথা তা কি আমাকে বলা যায়?’
‘উনি কি কাছে কোথাও আছেন?’
‘সে অসুস্থ।’
নাদিয়ার কণ্ঠে আগের ভদ্রতাভাবটি নেই।
‘অও আচ্ছা, আপনি উনার কী হন?’
‘আমি ওর বড় বোন, এখন নিশ্চয়ই আমাকে সেই জরুরী কথা বলতে বাধা নেই।’
একটু থেমে লোকটি জবাব দিলেন।
‘জ্বি, তা নেই। উনাকে শুধু এটুকু জানাবেন যে,   ‘প্রজেক্ট টোয়েন্টি ফোর’-এ উনার পাঠানো অ্যামাউন্টটি আমরা পেয়েছি।’
নাদিয়া কিছু বুঝল না। কীসের প্রজেক্ট, আর কীসের অ্যামাউন্ট?
‘একটু বুঝিয়ে বলুন তো।’
লোকটি এবার বলতে লাগলেন,
‘আমাদের প্রজেক্ট নং টোয়েন্টি ফোরের ভুক্তভোগী একজন দরিদ্র ব্যক্তি, যার মায়ের হার্টের বাইপাস সার্জারির জন্যে একটা বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন। সেজন্যে অনেকেই অনেক টাকা পাঠিয়েছেন। এদের মধ্যে আপনার ভাই নাদিম সাহেবও আছেন।’
নাদিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে যন্ত্রের মত গলায় বলল,
‘তার পাঠানো অ্যামাউন্টটা কত একটু বলুন। মানে এগজ্যাক্ট অ্যামাউন্ট পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিতের জন্যে আরকি।’
‘উনার পাঠানো অ্যামাউন্ট হচ্ছে পনের হাজার টাকা। এবং আরেকটা সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে যে, উনার মাধ্যমেই আমাদের এই প্রোজেক্ট টোয়েন্টি ফোরের মোট অ্যামাউন্ট পূরণ হয়ে গেছে। উনার পাঠানো টাকার সবগুলো এই প্রজেক্টে প্রয়োজন হয়নি, পাঁচ হাজার বেঁচে গেছে। তাই বেঁচে যাওয়া পাঁচ হাজার চলে যাবে আমাদের কমন ফান্ডে। তবে উনি চাইলে আমরা এই অ্যামাউন্ট পরবর্তী প্রজেক্টের জন্যে পেন্ডিং রাখতে পারি। উনাকে এটি জানিয়ে দিবেন।’
নাদিয়া একই রকম গলায় বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
‘আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন এবং উনার অসুস্থতাকে উনার জন্যে সহজ করে দিন,  আমীন। আসসালামু আলাইকুম।’
ফোনকল কেটে গেল।
এবং সমস্ত ঘটনাটাই নাদিয়াকে চমৎকৃত করল।

নাদিয়া তার ছোট ভাইয়ের রুমে উঁকি দিয়ে দেখল সে পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। তার গায়ে ঘামের একবিন্দুও অবশিষ্ট নেই। কাছে গিয়ে সে তার কপালে হাত দিল, সত্যিই তার গায়ে জ্বর এসেছে।
কপাল স্পর্শ করার কিছুক্ষণ বাদে নাদিম চোখ খুলল। জড়ানো কণ্ঠে বলল,
‘আপা, তুমি এখানে? কেমন আছ?’
নাদিয়া কিছু বলল না। সে আগে যা কখনো করেনি, আজ তা করছে। নাদিমের খাড়া খাড়া চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।
‘আপা, তুমি কি কাঁদছ?’
নাদিয়া অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। চোখে যে কখন পানি এসে গেছে তার খেয়ালই নেই।
‘কাঁদব কেন? আমার কী বিয়ে হয়ে গেছে নাকি? চোখে সমস্যা করছে। ‘
‘চোখে কি হয়েছে তোমার?’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাদিয়া জবাব দিল,
‘আজ আমার চোখ খুলে গিয়েছে। আমি আগের থেকে অনেক পরিষ্কারভাবে সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। তাই হয়ত চোখ থেকে পানি পড়ছে।’

হ্যাঁ, সেদিন নাদিয়ার চোখ খুলেছিল, ভ্রান্তি দূর হয়েছিল। এবং খুব ভালোভাবেই তা  হয়েছিল।

হয়ত প্রতিটি ঘরে ঘরেই এমন অনেক সদস্য আছেন, যাদের চোখ এখনও বন্ধ এবং তারা ভ্রান্তির ছলনায় আবদ্ধ। তারা মুক্তি পাবে কীসে?

যদি প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন শত শত নাদিমেরা থাকে, তবেই বোধহয় তারা এ থেকে প্রকৃতভাবেই মুক্তিলাভ করবে।

পরম করুণাময় যদি সহায়তা করেন, তবে এ মুক্তিলাভের পথ কিন্তু খুব দুর্গম হবে না।

Status

বোধ

১.

জনাব আহসানুল হক ইজিচেয়ারে বসে বসে একটি বই পড়ছিলেন। দিনের বেশিরভাগ সময়ই এখন তিনি বই পড়ে কাটান। উনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ-অধ্যাপক। একটি সরকারী কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। বছর পাঁচেক হলো তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন।

বইয়ের মধ্যে তিনি বুঁদ হয়ে ছিলেন। ঠিক এমন সময় তাঁর রুমে তাঁর একমাত্র নাতি আবরার ছুটে এল। ছুটে এসেই তাঁর বুকশেলফের আড়ালে সে লুকিয়ে পড়ে। এমনভাবে লুকোয়, যাতে করে বাইরে থেকে কেউ দেখতে না পায়। নাতির পায়ের শব্দে আহসান সাহেবের মনোযোগ ভেঙে যায়। তিনি জানেন তাঁর নাতি কেন এভাবে ছুটে এসেছে এবং লুকিয়েছে। তিনি এও জানেন যে এর পরে কী ঘটনা ঘটবে।

আহসান সাহেবের নাতি আবরারের বয়স ৩ কি ৪ হবে। স্কুলে ভর্তি হয়নি। তবে ভর্তি না হলে কী হবে, তার বাবা অর্থাৎ আহসান সাহেবের ছেলে আকরাম সাহেব তাকে ঘরে বসিয়েই দুনিয়ার যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাঠদান করছেন কয়েক মাস হলো। আহসান সাহেবের কাছে তার ছেলের এরূপ পাঠদান প্রক্রিয়া একেবারেই পছন্দ হয়নি। বাচ্চাদের কিছু শেখাতে চাইলে তাদের বয়স উপযোগী কিছু শেখানো উচিত। তারা বর্ণমালা চিনলেই যে তাদের ক্লাস ফোর-ফাইভের ‘সাধারণ জ্ঞান’ নামক এনসাইক্লোপিডিয়ার বই হাতে ধরিয়ে দিতে হবে, এর তো কোনো মানে হয় না। অথচ তাঁর ছেলে তা-ই করছে।

আহসান সাহেবের রুমে তাঁর ছেলে আকরাম ঢুকল। তার হাতে বেত, বিখ্যাত জালি বেত। একসময় এ বেত আহসান সাহেবের হাতেও শোভা পেত। তবে তিনি কখনও এর প্রয়োগ ঘটাননি।

  • আব্বা, হারামজাদাটা কই ?!

আহসান সাহেব চুপ করে থাকলেন। ছেলেকে খুব ভয় পান- এমন কারণে নয়। বরং তিনি ছেলের আচরণে এবং বচনে ক্ষুব্ধ, এই কারণে।

  • আব্বা, শুনছেন নাকি ? হারামজাদাটা কই ?!

আহসান সাহেব মুখ খুললেন।

  • জ্বি, কার কথা বলছ তুমি ?
  • ওই হারামজাদাটার কথা বলছি, বুঝতে পারছেন না ?
  • কোন হারামজাদা ? কীসের হারামজাদা ?
  • আবরারের কথা বলছি আর কী !

  • অও ! তাকে হারামজাদা বলছ ? সে হারামজাদা মানে তো তুমিই সেই ‘হারামি’ ব্যক্তি। তোমার বংশধরই তো সে।

  • আব্বা, এখন এসব নিয়ে কথা বলার কোনো মানে নেই। সে কোথায় আছে জানলে বলেন, আর না জানলে ‘জানি না’ বলে দেন। এত তর্কাতর্কির মানে কী ! আমাদের ভাইবোনদের কেউ তো এত তর্ক করে না। কেউ আপনার মত হইনি।

  • হ্যাঁ, আসলেই। অন্য কেউ হয়েছে কি হয়নি তা জানি না। তবে তুমি আমার মত হওনি। হলে  তোমার ভয়ে আবরার আজ আমার রুমের বুকশেলফে লুকিয়ে যেত না। তোমার কোলেই সে বসে থাকত, তোমার কথাই সে শুনত।

  • বুঝতে পেরেছি, হারামজাদাটা বুকশেলফের আড়ালে। দাঁড়া, তোর একদিন কি আমার একদিন, মোট দুইদিন !

আহসান সাহেব ছোট নিঃশ্বাস ফেললেন। উচিত কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজের নাতিকেই বিপদে ফেলে দিয়েছেন। কথা ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হলে তিনি ফিরিয়ে নিতেন, কিন্তু তা সম্ভব নয়।

আবরারের কান টেনে নিয়ে তার বাবা তাকে নিজের রুমে ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর জালি বেতের সেই নির্মম শব্দ শোনা গেল। আর এরপর শোনা গেল তার আদরের নাতির আকাশ ফাটানো আর্তনাদ।

তাকে কীজন্যে মারা হচ্ছে, তা আর আহসান সাহেবের জানতে ইচ্ছে করে না। হয়ত যোগ-বিয়োগ অঙ্কে ভুল করেছে, কিংবা কোনো ইংরেজি শব্দের বানানে ভুল করেছে, অথবা মানবদেহের সর্বমোট হাড়ের সংখ্যা বলতে ভুল করেছে কিংবা বলতে পারেনি।

২.

আকরাম সাহেব নিজের রুমে বসে টিভি দেখছেন। বেশিরভাগ সময়ে তিনি সংবাদের চ্যানেলগুলোতেই আটকে থাকেন। আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেলগুলোই তাঁর প্রিয়, দেশীয় চ্যানেলগুলোতে তাঁর যাওয়াই হয় না। দেশীয় চ্যানেলগুলোতে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই, সবই একটি পক্ষের হয়েই যাবতীয় সংবাদ প্রচার করে। তাছাড়া তিনি বিরোধী দলকে সমর্থন করেন। তাই স্বভাবতই দেশের নিউজ চ্যানেলগুলো তাঁকে তৃপ্ত করতে পারবে না।

 

আকরাম সাহেবের স্ত্রী তাঁর হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে বললেন,

  • ‘আব্বা তোমাকে ডাকছেন। যাও দেখা করে এসো।’
  • ‘আব্বাকে বলে দাও এখন আমি খবর দেখছি।’
  • ‘আমার মাধ্যমে না বলে কথাটা নিজে গিয়েই বলে আসো না !’

  • আকরাম সাহেব নিজের স্ত্রীর দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালেন। সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাঁর স্ত্রী হাতে রিমোট নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিলেন।

    • ‘সংবাদ দেখে এত জ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে একজন জ্ঞানী লোকের ডাক শুনে তিনি কী বলতে চান তা শুনে আসো। উনি তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছেন।’

    অনিচ্ছা সত্ত্বেও আকরাম সাহেব উঠে পড়লেন।

    ৩.

    -‘আব্বা, ভেতরে আসবো ?’

    আহসান সাহেব ‘নবীদের কাহিনী’ নামক একটি বই পড়ছিলেন। ছেলের অনুমতিবাক্যে তাঁর মনোযোগ ভাঙল বলে মনে হল।

    • ‘হ্যাঁ, আসো, বসো।’

    ছেলে সামনে এসে বসল। বাবার সামনে সকালবেলায় তিনি যে রূপে ছিলেন, সেটির সাথে এই মুহূর্তের রূপ ঠিক মিলছে না। চুপচাপ বাবার সামনের চেয়ারে দৃষ্টি নিচু করে তিনি বসে আছেন। হয়ত তিনি বুঝতে পারছেন যে তাঁর বাবা এখন তাঁকে কী ধরণের কথা বলবেন। সকালবেলায় তাঁর কৃত অপরাধের জবাবদিহি চাইতে পারেন, অথবা হাতের বই থেকে কিছু নীতিবাক্যও শোনাতে পারেন।

    • ‘আকরাম, তোমার বয়স কত হলো?’

    আকরাম সাহেব বোধহয় কথাটি ঠিক বুঝতে পারেননি।

    • ‘জ্বি আব্বা , কী বললেন ?’
  • ‘বললাম যে তোমার বয়স কত হয়েছে?’
  • ‘জ্বি? আআআ… সামনের এপ্রিলে ৩৬ হবে।’

  • ’৩৬, মাশাআল্লাহ ! তুমি তো অনেক বড় হয়ে গেছ ! মনে হয় সেদিনই তোমাকে হাফ প্যান্ট পরে দৌড়োতে দেখতাম। হাহ হাহ হাহ।’

  • এ ধরণের কথায় সাধারণত সমর্থন দিতে হাসতে হয়। কিন্তু আকরাম সাহেব বললেন,

    • ‘এটা বলার জন্যেই কি আমাকে ডেকেছেন ?’
  • ‘কেন, তুমি কি জরুরী কোনো কাজ করছিলে ?’
  • টেলিভিশনে সংবাদ দেখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কোনো ‘জরুরী কাজ’-এর তালিকায় পড়ে না। তাই আকরাম সাহেব চুপ করে থাকলেন।

    • ‘আকরাম, তোমার হাঁটুতে ব্যথা আছে ?’
  • ‘না তো !’
  • ‘আচ্ছা, চোখে কম দেখ ?’

  • ‘কই না !’

  • ‘অও। হাড়ের সন্ধিতে মানে গিরায় গিরায় ব্যথা-ট্যথা হয় ?’

  • ‘নাহ !’

  • ‘সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে পার ?’

  • ‘ কী যা-তা বলছেন ! হাঁটুতে ব্যথা না থাকলে সিঁড়ি ভাঙতে পারব না কেন ?’

  • ‘তাও অবশ্য ঠিক। কিন্তু এসব সমস্যা তো আমার আছে।’

  • ‘তা তো থাকতেই পারে। আপনি বুড়ো হয়েছেন না !’

  • ‘হ্যাঁ , তা তো হয়েছিই।’

  • ‘বুড়োদের এসব হবে, তা-ই তো স্বাভাবিক, আব্বা।’

  • ‘আচ্ছা, এসব সমস্যা যদি তোমার বয়েসী কারও অথবা ২০-২৫-৩০ বছর বয়েসী কারও থেকে থাকে, তাহলে সেটা কী স্বাভাবিক ?’

  • ‘অবশ্যই না।’

  • ‘কেন?’

  • ‘কারণ একেকটা বয়সে মানুষ একেক রকম অবস্থায় থাকে। শিশুরা থাকে চঞ্চল, কিশোরেরা থাকে কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল, যুবকেরা থাকে দায়িত্বসচেতন, মধ্যবয়স্করা থাকে সাংসারিক নানান ঝামেলায় জর্জরিত, এবং বুড়োরা বা ভদ্র ভাষায় বললে প্রবীণেরা থাকে শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত। প্রবীণদের রোগবালাই যুবকদের মধ্যে দেখা দিলে তা তো আসলেই মহাঝামেলার কারণ।’

  • ‘বাহ, ভালোই তো জান এসব ব্যাপারে।’

  • ‘বইপত্র থেকে জেনেছি। আমি খুব পড়াশুনা করি।’

  • ‘আচ্ছা, কেউ কী মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতে পড়াশুনা করতে পারে ?’

  • ‘আব্বা, আপনি ভালো করেই জানেন যে তা কখনোই সম্ভব নয়।’

  • ‘তা জানি। আচ্ছা, প্রবীণদের বা বুড়োদের কোনো প্রকার রোগবালাই থাকলে তা অন্যদের চোখে স্বাভাবিক। কিন্তু যুবকদের এসব রোগবালাই থাকলে তা অস্বাভাবিক কেন?’

  • ‘কারণটা আপনাকে একটু আগেই তো বলেছি আব্বা। নির্দিষ্ট বয়সের নির্দিষ্ট অবস্থাই এর কারণ। বুড়ো বয়সে শরীরের কলকব্জাগুলো নষ্ট হতে থাকে, তাই এসব দেখা দেয়। কিন্তু কারো যৌবনে যদি শরীরের কোনো অংশ নষ্ট হয়ে যায়, তবে তাদের জন্যে তা তো আসলেই দুর্ভাগ্যজনক। আর তাদের দেখে আমরা করুণা ছাড়া তো আর কিছুই করতে পারি না।’

  • ‘আমার ধারণা ছিল তুমি বোকা। কিন্তু এখন দেখছি তুমি অনেক কিছুই জান। কিন্তু এতকিছু জান, এটি দেখার পরেও তুমি আমার নিকট বোকাই থেকে গেলে।’

  • ‘কেন, বোকা থেকে গেলাম কেন?’

  • ‘বুড়ো বয়সে আসার আগেই কেউ যদি হাঁপানী, ডায়াবেটিস, ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তাদেরকে তোমরা দুর্ভাগা বল; তাদের জন্যে তোমরা করুণা ছাড়া আর কিছুই করতে পার না।’

  • ‘হ্যাঁ, তো ?’

  • ‘কিন্তু একটি নির্দিষ্ট বয়সে যাওয়ার আগে যখন কাউকে শেখানো হয় যে ’দুই দু’গুণে চার’, কিংবা ‘মানুষের হাড়ের সংখ্যা ২০৬টি’, কিংবা ‘জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা হলেন এই লোক’, তখন মনে হয় তোমার কোনো করুণা হয় না বা তাকে দুর্ভাগা বলে মনে হয় না।’

  • আকরাম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

    • ‘আব্বা, আপনি এই কথাগুলো সরাসরি বলে ফেললেই পারতেন। এত ত্যানা প্যাঁচানোর তো কোনো মানে হয় না।’
  • ‘কথাগুলো বলার আগে কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে তুমি কি কোনো জরুরী কাজ করছিলে কি না। তুমি চুপ ছিলে, তাই ভাবলাম তুমি ব্যস্ত নও। তাছাড়া, তোমার মত ব্যক্তিত্বের মানুষের সাথে কথা বলতে হলে এভাবেই বলা উচিত বলে আমি মনে করি।’
  • ‘সরাসরি বললে আমি কি শুনতাম না।’

  • ‘সেটা আমি জানি না। তবে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝেছি, তা হল সরাসরি তোমাকে বললে তুমি শুনতে না। এর আগে তোমাকে প্রায় ৫-৬ বার এভাবে ডাকা হয়েছিল। তুমি এসেছিলেও। আমি তখন অভিযোগগুলো সরাসরি করেছিলামও। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। কারণ, তুমি মনে কর তুমি যা করছ তাই সঠিক। অন্যেরা তোমার ব্যাপারে কিছুই বলতে পারে না। শুনেছি, বৌমা তোমাকে এসব নিয়ে কিছু বললে নাকি তাকে তুমি ঝামটা মেরে থামিয়ে দাও। আমি তো আশঙ্কা করছি যে, তোমার বাবা না হলে হয়ত তুমি আমাকেও ঝামটা মেরে থামিয়ে দিতে।’

  • আকরাম সাহেব চুপ করে রইলেন। তিনি রেগে যাচ্ছেন না, বরং সম্ভবত এই প্রথমবারের মত অন্য কারো কথা তাঁকে ভাবিয়ে তুলছে।

    • ‘আমার এসব কথার উপসংহার কী হবে, তা তুমি আঁচ করে ফেলেছ ইতিমধ্যেই। তাই কথা বাড়াচ্ছি না। তোমাকে আমি একথা বলব না যে, যাও তোমার স্ত্রী-সন্তানের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নাও। তুমি তা কখনোই হয়ত করবে না। কারণ তুমি কারো নিকট ছোট হতে চাও না। এর চেয়ে বরং আমি একথা বলব যে, তুমি তাদের সাথে ভবিষ্যতে এমন আচরণ ও ব্যবহার করবে, যাতে করে তারা নিজেনিজেই তোমাকে ক্ষমা করে দেয়। তুমি হয়ত ভাবছ, ৩-৪ বছরের বাচ্চা আবার এসব কী বুঝে। কিন্তু একটা কথা ভুলে যেও না যে সে বাচ্চা হলেও কিন্তু সে মানুষ। তারও একটা মন আছে। সেই ছোট্ট মনে সে পছন্দের মানুষদের একে একে জায়গা করে দিচ্ছে। তুমি তার বাবা, সেই ছোট্ট মনে তোমার জায়গা এখনও হয়নি। সেই ছোট্ট জায়গায় নিজের জায়গা করে ফেল সময় উত্তীর্ণের আগেই। এমনভাবে নিজেকে তুলে ধর, যেন তোমাকে দেখে সে ভয়ে পালিয়ে না গিয়ে তোমার কোলেই যেন সে ছুটে আসে।’

    আকরাম সাহেব কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে উঠে পড়লেন। কোনো প্রকার ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি কিংবা নেতিবাচক অস্বীকৃতি- কিছুই জানালেন না তাঁর বাবাকে।

    শেষ অংশ

    ‘ওয়ান অ্যাপেল প্লাস ওয়ান অ্যাপেল , ইজ টু-অ্যাপেল। টু’অ্যাপেল ফর ইউ।’

    এরকম অদ্ভুত বাক্য কখনো আহসান সাহেব শুনেননি। শুনেই বুঝা যাচ্ছে এটি গণনা বিষয়ক কোনো কিছু। টেলিভিশনে এসবও দেখায় তাহলে আজকাল। তিনি শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখলেন শব্দটি তাঁর ছেলের রুম থেকে আসছে। স্ট্রেচার এগোতে এগোতে তিনি ছেলের রুমের দরজায় উঁকি দিয়ে দেখেন, তাদের টিভিতে বাচ্চাদের কিছু একটা দেখান হচ্ছে এবং টিভির সামনে আনন্দে লাফাচ্ছে তাঁর নাতি আবরার।

    ‘থ্রি পেন্সিল প্লাস টু পেন্সিল, ইজ ফাইভ-পেন্সিল। অল আর ফর ইউ।’

    টিভির পর্দায় তিনটি পেন্সিল আর দু’টি পেন্সিলের ছবি ভেসে উঠতে উঠতে শব্দটি শোনা গেল। আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল আবরারের পিতামাতা বিছানায় বসে ছেলের কর্মকাণ্ড দেখছেন। তাঁদের উভয়ের মুখেই হাসি। আবরারের যে বাবা তাঁর ছেলেকে কার্টুন দেখারই অবসর দিত না, সে কি না আজ তাকে নাচতে দেখেও হাসছে- দৃশ্যটা খুব অদ্ভুত লাগল আহসান সাহেবের।

    -‘আবরার বাবা, বল তো টু প্লাস থ্রি কত?’ – আকরাম সাহেবের প্রশ্ন।

    • ‘আব্বু, ফাইভ !’
  • ‘ভেরি গুড ! এখন আমার হাতে একটা ‘ফাইভ’ দাও তো !’
  • আবরার তার বাবার হাতে তালি বাজাল।

    আহসান সাহেবকে তাঁর ছেলে-বউমা-নাতি , কেউই খেয়াল করেনি। এবং সাথেসাথে তারা এও খেয়াল করেনি যে এ মধুময় দৃশ্য দেখে আহসান সাহেবের চোখের কোণে পানি এসে গিয়েছিল এবং তিনি তা মুছে ফেলেননি। তাই তা টপ করে তাদের রুমের দরজার সামনে গড়িয়ে পড়েছিল।

    কৃতজ্ঞতা

    ১.
    অক্টোবর, ২০১৫। সম্ভবত মাসের ১৭ কিংবা ১৮ তারিখ হবে। সকালবেলায় আমার মা ঘুম থেকে আমাকে উঠিয়ে দিলেন। মামার বাড়িতে একটি জরুরী কাজে যেতে হবে। মামার বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে। যানবাহন বা পায়ে হেঁটে, যেকোনভাবেই যাওয়া যায়।

    আমি আমার সাইকেল বের করলাম। আমার প্রিয় সাইকেল। সাইকেলে করে মামার বাড়িতে অনেকবার আসা-যাওয়া করেছি। ভালোই লাগে এভাবে আসা-যাওয়া করতে। সাইকেল চালানোর আনন্দ যে কতটা মধুর, তা যারা সাইকেল চালান তারা ব্যতীত অন্যদের বুঝানো বোধহয় সম্ভব নয়।

    সাইকেল নিয়ে বের হলাম সকাল সাতটা পনের কিংবা বিশ মিনিটের দিকে। বাসায় ফিরলাম ঠিক সাড়ে সাতটায়। পনের মিনিটের মত পার হলো মাত্র। মামার বাড়ির কাজে আর আওয়া হয়নি। এই পনের মিনিটেই যা হওয়ার হয়ে গেছে।

    সাইকেল যথাস্থানে রেখে আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম লম্বালম্বি হয়ে। হাতের কনুই, পায়ের গোড়ালিতে জ্বালা অনুভব করছি। আমার মা কাছে এসে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করতেই ইশারা দিয়ে তাঁকে থামিয়ে দিলাম এবং বুঝিয়ে দিলাম, আমাকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও।

    কনুই ও গোড়ালির ব্যথা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়া শুরু করেছে। শরীরের আরো বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা জানান দিচ্ছে একটু একটু করে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলাম। শোয়াবস্থা থেকে বসলাম। ছোট বোনকে বলে স্যাভলন আনালাম। একটু একটু করে ক্রিম লাগাতে শুরু করলাম ক্ষতস্থানে। কেটে যায়নি, তবে ছিলে গেছে শরীরের বিভিন্ন জায়গায়।

    ধকল কাটতে শুরু করলে মাকে ডাকলাম। তাঁকে খুলে বললাম কী কী হল এই পনের মিনিটে। অন্যান্য মায়েদের মত আমার মাও এটি শুনে খুব ব্যথিত হলেন। বড় ভাইও শুনল, তবে তাঁর কোনো ভাবান্তর হলো বলে মনে হয়নি।

    আমার সাইকেল চালানো বন্ধ হলো। আমি নিজেই জেদের কারণে বন্ধ করেছি। এমন নয় যে আমি সাইকেল চালানোর মত শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। তবে আমার বাবা আমার সাইকেল চালানোর দক্ষতা নিয়ে যে ধারণা রাখতেন বলে আমি বিশ্বাস করতাম- সেটি আমি হারিয়েছি। বাবার উপর তো আর রাগ করা চলে না, তাই সাইকেলের উপর দিয়েই রাগ ঝেড়ে দিলাম।

    ২.
    জানুয়ারি, ২০১৬। প্রায় তিন মাস হতে চলল আমার সেই ঘটনার। সাইকেল চালানো পুরোপুরি বন্ধ। জেদ কাটেনি। মামার বাড়িতে বিভিন্ন কাজে যাই। হেঁটেই যাই। তাছাড়া শীতকাল, শরীর গরম রাখতে এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না।

    বড় ভাই রোজকার মত সকালবেলা কাজে যায় আর রাতের বেলায় ফিরে আসে। সে যে দোকানের কর্মচারী, সেটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিনই ট্রাক-বাসসহ অন্যান্য যানবাহন দোকানের সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করে।

    বড় ভাই বাসায় ফিরে রাতের খাবার খাওয়ার পূর্বে এবং ঘুমিয়ে যাওয়ার পূর্বে প্রতিদিনই বর্ণনা করে সারাদিনে তাঁর কর্মস্থলে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কী কী ঘটেছে।

    একরাতে সে এমন একটি ঘটনা বর্ণনা করছিল। ঘটনা নয়, বরং দুর্ঘটনা বললে সঠিক হবে।

    দুর্ঘটনাটি ছিল রিকশা-ট্রাক কলিশন। একটি যাত্রীবাহী রিকশা। তাতে যাত্রী হিসেবে ছিল এক মধ্যবয়স্ক লোক এবং তাঁর সাথে একটি বাচ্চা ছেলে। রিকশাটি অন্য একটি রোডে বাঁক নিচ্ছিল। একই সময়ে সেই রোড থেকে একটি ট্রাক এগিয়ে আসছিল। কিন্তু রিকশাটি ব্রেক কষলেও ট্রাকটি তা করেনি। রিকশার উপর দিয়ে সেটি চলে যায় কিছুদূর।

    ঘটনা ঘটাকালীন রিকশাচালক রিকশা থেকে লাফ দেন। রিকশা-আরোহী লোকটি বাচ্চাটিকে তৎক্ষণাৎ রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেন। তাই এ দুর্ঘটনার ক্ষতি থেকে রিকশা-চালক এবং সেই বাচ্চাটি রেহাই পেলেও লোকটি পাননি। তাঁর বাম অথবা ডান পায়ের উরুর উপর দিয়ে ট্রাকটি চলে যায়, এবং একটি বীভৎস দৃশ্যের অবতারণা করে।

    আশেপাশের মানুষ ভীড় করে তখন ভয়ার্ত চোখে তাঁর বিধ্বস্ত দেহের দিকে তাকিয়ে ছিল। কেউ ভয়ে এগিয়ে আসছে না। শেষমেশ লোকজন সম্বিত ফিরে পেলে তাঁকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।

    আমার ভাই এ ঘটনা বর্ণনার পর রাতের খাবার খেতে চলে গেল। এদিকে আমি ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে গেলাম। আমার মনে হতে লাগল যে কিছুক্ষণ পূর্বে যে লোকটি অন্য দশজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মত ছিলেন, তিনি এক পলকেই দেহের একটি অংশ হারালেন।
    আমার কল্পনায় দু’টো দৃশ্যপট ভেসে ওঠলো। একটি কিছুক্ষণ আগে শোনা দুর্ঘটনাটির অদেখা দৃশ্যপট, অন্যটি অক্টোবর ’১৫-এর শেষদিকে ঘটে যাওয়া আমার সাইকেল দুর্ঘটনার দৃশ্যপট। দু’টোকে তুলনা করতে লাগলাম, আর বারবার শিউরে ওঠলাম।

    ৩.
    সেদিনকার সাইকেল দুর্ঘটনাটি কেমন ছিল, তা জানতে সময়টাকে রিভার্স করলাম।

    সকাল সাতটা বেজে পনের কি বিশ মিনিট। সাইকেল বের করলাম। গন্তব্য মামার বাড়ি। আমাদের বাড়ি থেকে প্রধান সড়ক অর্থাৎ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হেঁটে যেতে লাগে পাঁচ মিনিট। যেখানে সাইকেলে যেতে লাগে প্রায় দু’মিনিটের মত। লোকাল সড়ক থেকে মহাসড়ক একটু উঁচু। আমি সাধারণত মহাসড়কে উঠার আগে সাইকেল থামিয়ে একটু এদিক-সেদিক তাকিয়ে তারপর সাইকেল চালাতে শুরু করে দেই।

    সেদিনও তাই হয়ত করতাম। তবে সড়কের ডানদিকে তাকানোর সময় দেখলাম একটি টেম্পু থেমে আছে। এর পেছনে কোনো গাড়ি নেই। আমি নিশ্চিন্ত মনেই তাই সাইকেল না থামিয়েই মহাসড়কে উঠিয়ে নিলাম।

    যেই আমি সড়কে সাইকেল উঠালাম, অমনি ডানদিকে থাকা টেম্পুর পাশ থেকে এক বিদ্যুৎচালিত চলন্ত রিকশা আমাকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিল। টেম্পুর কারণে সেই রিকশাটি আমার চোখ থেকে তখন আড়াল হয়ে ছিল।

    সেই যে কেমন অনুভূতি, তা আমি এখনও চোখ বন্ধ করে মনে করতে পারি। ধাক্কা লাগার সময়ে আমার মনে হল এটি বাস্তব নয়, হয়ত বা স্বপ্ন। তখন আমার মনে হল আমি চোখে কিছুই দেখছি না। শুধু সংঘর্ষের শব্দটি শুনতে পেলাম। আর বুঝতে পারলাম যে, আমাকে অনেক দূরে ছিটকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেখান থেকে রিকশার সাথে সংঘর্ষ হলো, তা থেকে প্রায় ২০-২৫ ফুট দূরে গিয়ে আমি উলটে পড়ে গেলাম। আধশোয়াবস্থায় রাস্তার মাঝে বসে রইলাম। দু-তিন সেকেন্ড সময় লাগল ঘোর অবস্থা কেটে যেতে।

    সাথেসাথেই আমি উঠে দাঁড়ালাম। সাইকেলটি একপাশে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সেটির দিকে ছুটে গিয়ে সেটিকে উঠয়ে রোড ডিভাইডারের পাশে এনে রাখলাম। এরপর চোখ পড়ল রোডের ওপর। এক ঝাঁক ইলিশ মাছ রাস্তার উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ডিভাইডারের পাশে এক লোক চোখ বন্ধ করে বসে রয়েছেন এবং ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছেন। প্রথমবার মনে হল, ইনিই রিকশাচালক। পরে লোকজনের কথাবার্তায় বুঝলাম তিনি ছিলেন রিকশা-আরোহী।

    মনে মনে নিজেকে প্রস্তত করছিলাম আশেপাশের মানুষজনের গালাগাল শোনার জন্যে। কিন্তু দুর্ঘটনার ধকলে আমিও বিধ্বস্ত। আমার চোখেমুখে তখন বিধ্বস্ততার ছাপ ছড়িয়ে পড়ছে। শরীরের ব্যথা তখনো অনুভব করা শুরু করিনি।

    আমার সাইকেলের মুখ আসলেই থুবড়ে গেছে। সেটি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব নয়। আমি দ্রুত চলে যেতে চাইছিলাম। লোকজন আমাকে কিছু বলল না, সম্ভবত আমার মুখের বিধ্বস্ত ভাব দেখে তাদের মায়াই লেগেছিল। তবে মুখে না বললেও ইশারা-ইঙ্গিতে তারা আমার দোষ বর্ণনা করছিল।

    এক লোক আমাকে পরামর্শ দিল যেন মাজারে গিয়ে পাঁচ টাকা দান করে বিপদ দূর হওয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আসি। মনে মনে তার পরামর্শকে নাকচ করে আমি সাইকেল নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরে আসলাম। তখন ঘড়িতে সাড়ে সাতটা বাজছিল।
    আমার শরীরের কয়েকটি জায়গায় ছিলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো ক্ষতি হয়নি।

    ৪.
    দুর্ঘটনাটির ইতিবাচক ব্যাপারগুলো আমার চোখে এতদিন ভালো করে পড়েনি। তবে সেই ট্রাক-রিকশা সংঘর্ষের ঘটনা শোনার পর তা অনেক স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হলো।
    আমি যে সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হই, সেটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। প্রতিদিন-প্রতিরাতে ঢাকা থেকে এবং ঢাকার পথে যাত্রীবাহী বাস ও মালবাহী ট্রাক এবং লরি আসা-যাওয়া করে।

    ট্রাক-রিকশার সংঘর্ষের সেই সড়কটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেখানে ঢাকা-চট্টগ্রামের বাস-ট্রাকের আনাগোনা খুব বেশি নয়। একেবারেই যে নেই তা নয়, তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এর তুলনায় কম।

    যদি আমার সাইকেল দুর্ঘটনার সময়ে সেখানে কোনো বাস বা ট্রাক চলত, তবে ঘটনাটা কী ঘটত! আমি ছিটকে পড়েছিলাম রাস্তার মাঝে, এবং তখন যদি কোনো ট্রাক আমার দিকে ধেয়ে আসত, আমি নির্ঘাত মারা পড়তাম। অথবা পায়ের উপর দিয়ে গেলে আমি পঙ্গু হয়ে যেতাম। কিন্তু আল্লাহ্‌র অশেষ মেহেরবাণী যে সেদিন সকালবেলায় রোডে কোনো বাস-ট্রাক বা অন্য যানবাহন চলাচল করছিল না।

    তবে ট্রাক-রিকশার কলিশনের সে ঘটনায় লোকটি মারাত্মকভাবে আহত হন, যদিও সে সড়কটি তেমন ব্যস্ত সড়ক নয়।

    এখানে ভাগ্যের বিষয়টি স্পষ্ট। আল্লাহ সে লোকটির ভাগ্যে সেই দুর্ঘটনাটি রেখেছিলেন। তবে আমার ভাগ্যে দুর্ঘটনা রাখলেও এর ক্ষতি রাখেননি।

    আমার ভাগ্য এবার আল্লাহ সুপ্রসন্ন রেখেছিলেন, কিন্তু ভবিষ্যতে যে রাখবেন তা তো নয়। এই দুর্ঘটনা দ্বারা তিনি আমাকে সতর্ক করেছেন যেন আমি তাঁর দিকে ফিরে যাই।

    ভাগ্যের কথা বলে আমি বলতে চাচ্ছি না যে রাস্তায় সাবধান হয়ে চলবেন না। অবশ্যই রাস্তায় সাবধান হয়ে চলতে হবে। তবে সাবধানতার উপর জীবন-মৃত্যু নির্ভর করে না। সে লোকটি যে রিকশায় ছিলেন, সেটি সাবধান হয়ে ব্রেক কষেছিল। কিন্তু তিনি সেই সাবধানতার ফল পাননি। ট্রাকচালকের অসাবধানতার ফল লোকটির উপর দিয়ে চলে গেল। লোকটির ভাগ্যই তাঁকে সে স্থানে এনেছিল।

    হয়ত আমার ভাগ্যেও এমন কোনো দুর্ঘটনা অপেক্ষা করছে। সেটি হয়ত আজ হয়নি কিন্তু কাল, পরশু, এক মাস পর কিংবা এক বছর পর হতে পারে। সেই সময় আসার আগেই আমার উচিত নিজেকে সংশোধন করা। আমার এ জীবনটাই শেষ নয়, পরবর্তী জীবনেও আমাকে যেতে হবে।

    অবশ্য দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু হলে কিংবা অঙ্গহানি হলে তা দিয়ে সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য যাচাই করাটা বোকামি। প্রকৃত সৌভাগ্যশীল ব্যক্তি তো তাঁরাই, যাঁদের নাম জান্নাতে দাখিলের তালিকায় ইতোমধ্যে লিখে ফেলা হয়েছে।

    পার্থিব জীবনে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হোক বা না হোক, পরবর্তী জীবনের ভাগ্য যেন আমাদের সুপ্রসন্ন হয় সে কামনাই করি।

    শেষ কথা :
    আমি জানি না লোকটির অবস্থা এখন কেমন। তিনি বেঁচে আছেন কি নেই, তাও জানা নেই। মারা গিয়ে থাকলে আল্লাহ তাঁর গোনাহ ক্ষমা করুন (যদি মুসলিম হয়ে থাকেন) এবং তাঁকে জান্নাত নসিব করুন। আর বেঁচে থাকলে তাঁকে তাঁর অবস্থা মেনে নেয়ার মত ধৈর্য্যশক্তি দান করুন এবং তাঁকে এর উত্তর বিনিময় দিন।

    আল্লাহ তা’আলা তাঁর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেছেন, তাই আল্লাহ তাঁকে এর বিনিময় অবশ্যই দিবেন।

    আল্লাহ্‌র প্রতি নিজের যাবতীয় অবস্থানের জন্যে কৃতজ্ঞ হওয়াটাই আমাদের উচিত।

    মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

    তাদের দিকে তুমি তাকাও, যারা তোমার চেয়ে নিচু স্তরে আছে। তাদের দিকে তাকিও না, যারা উঁচু স্তরে আছে। এভাবেই আল্লাহ তোমাকে যে নি’আমতরাজি দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন, তাঁর কৃতজ্ঞতা তুমি প্রকাশ করতে সক্ষম হবে।
    [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম]

    আল্লাহ আমাদের সতর্ক করুন এবং প্রত্যেক অবস্থায় তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার ক্ষমতা প্রদান করুন, আমীন।

    ছায়া

    রিমন ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি থেকে বের হলো। সে একটি বইয়ের খোঁজে এসেছিল, কিন্তু সেটি পায় নি। বইটির তার খুবই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্র‍্যোজনের সময় অনেক কিছুই পাওয়া যায় না।
    লাইব্রেরি থেকে বের হতেই সবুজের সাথে দেখা। লালচে ধরণের সানগ্লাস তার চোখে। হাতে ব্রেসলেট। চুলের সামনের অংশ আকাশমুখী হয়ে আছে।
    সবুজ বলল, “রিমন,  আছস কেমন?”
    রিমন বলল, “আসসালামু আলাইকুম। আলহামদুলিল্লাহ,  ভালোই আছি। তুই কেমন আছিস?”
    -আমি ভালো নাই। আচ্ছা, আমি হইলাম তোর ক্লাসমেট। আর তুই কিনা আমারেই সালাম দিস, ব্যাপারটা কী?
    -আমি যে মুসলিম। আমাদের উচিত একে অপরকে দেখামাত্রই সালাম দেয়া।
    – আচ্ছা বুঝছি, বুঝছি। আর বলতে হইবো না। তো কই গেছিলি?
    -লাইহ্রেরিতে। এখন ক্লাসে যাব। তুই ক্লাস করবি না?
    -না রে। আমার বিশেষ কাজ আছে।
    – কী কাজ?
    – ঐ তো আছে আর কি (চোখ টিপে)।
    এ সময় সবুজের মোবাইল বেজে ওঠল। সে তা রিসিভ করে কানে দিয়ে কথা বলতে লাগল,
    – হ্যালো….হ্যাঁ, লক্ষ্মীটি, কেমন আছ?…..অহহো, ভালো নেই কেন সোনা?….গলায় ব্যথা? আচ্ছা, আজ তোমাকে গরম গরম অ্যাক্সপ্রেসো কফি খাওয়াবো ক্যান্টিনে।…….তুমি এখন কই?……ভার্সিটিতে??!!  আমারে আগে বলবা না? এত তাড়াতাড়ি আইস্যা পড়ছো?……আচ্ছা, দাঁড়াও দুই মিনিট। আমি লাইব্রেরির সামনে আছি।…আচ্ছা আচ্ছা রাখি।”
    রিমনের দিকে তাকিয়ে বলল,
    “রিমন, আইজকা যাইগা। ঐ বলছিলাম না বিশেষ কাজ আছে। সেই কাজ করতে যাইতেছি। ভাবতেই কেমন যেন লাগতাছে!!”
    রিমন বলল,
    “সবুজ, তোকে অনেকবার বলেছি যে এসব খুব খারাপ কাজ। প্লিজ এসব থেকে বেরিয়ে আয়। নিজের ইহকাল আর পরকাল ধ্বংস করিস না। ”
    -“আরে তুই তোর লেকচার রাখ। তোরে তো আমি প্রেম করতে কইতেছি না! তুই তোর জবাব দিবি, আমি আমারটা দিব। আল্লাহ যদি পরকালে তোরে ধরে তো তুই উনারে কইয়্যা দিস যে তুই চেষ্টা করছিলি কিন্তু আমার বন্ধু কথা শুনে নাই। এরপর আল্লাহ আমারে ধরলে আমি যা বুঝানোর বুঝায়া দিমু উনারে।  যত্তসব!”

    সবুজ হনহন করে চলে গেল।

    রিমন অন্যান্য দশটা সাধারণ পুরুষ মানুষের মতই একজন। তারও রয়েছে সেসব পুরুষ মানুষের মত প্রকৃতি, সাধ-আহলাদ। কিন্তু সে চাইলেই সেসবের বাস্তবায়ন নিমিষেই করে ফেলতে পারে না। তার যেসব সাধ-আহলাদ বাস্তবায়নে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান সম্ভব, শুধুমাত্র সেগুলোকেই সে গুরুত্ব দেয়, এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ কর্ম থেকে সে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।
    রিমন এসব এম্নিএম্নিই করছে না। সে খুব ভালো করেই জানে, এসব ব্যাপারে যত্নশীল হলে আখিরাতে আল্লাহ তা’আলার আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাওয়া যাবে। সে ছায়া কোনো সাধারণ বৃক্ষের বা ভবনের ছায়ার মত নয়। বরং সে ছায়া অনেক বরকতময় ও কষ্ট নিবারণকারী।

    আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    “যে দিন আল্লাহর (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন।
    (তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন)
    ….সে যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে তার প্রতিপালকের ইবাদতের মধ্যে।…”

    (সহীহ বুখারী – ১৪২৩, ৬৪৭৯; সহীহ
    মুসলিম ১২/৩০, হাঃ ১০৩১,আহমদ ৯৬৭১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৬২০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৬২৭)

    বি: দ্র: নিচের বিজ্ঞাপনের সাথে এই ব্লগসাইটের পরিচালনা পরিষদ কোনোভাবেই জড়িত নয়।

    ‘আম্মু!’

    ত্বালহা চুপচাপ তার পড়ার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে আছে। তার বইপত্র খোলা কিন্তু সে পড়ছে না। তার মনোযোগ যে পড়ার মধ্যে নেই এটি তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
    তার বাবাও এটি বুঝতে পারলেন। কাছে এসে বললেন,
    “কী ত্বালহা মিয়াঁ, পড়ছো না কেন?”
    ত্বালহা বাবার দিকে বিরক্তমুখে তাকিয়ে বলল,
    “বাবা আমাকে ‘মিয়াঁ, মিয়াঁ’ বলে ডেকো না তো। খুব রাগ লাগে!”
    বাবা হেসে দিলেন। পাশের চেয়ার টেনে তার পাশে বসতে বসতে বললেন,
    “আচ্ছা ঠিক আছে আর ‘মিয়াঁ’ ডাকবো না। এখন বল পড়ছো না কেন? পড়তে ইচ্ছা করছে না?”
    “না!”
    “না? কেন?”
    “আমার মন খারাপ!”
    “মন খারাপ কেন? ”
    “আম্মু বকেছে?”
    “বল কী!  কীজন্যে? ”
    “আমি আজ ক্লাস টেস্টে কম নাম্বার পেয়েছি এজন্যে।”
    “হুম। তোমার আম্মুর এটা করা একদম উচিত হয়নি।”
    “আমিও এটাই বলছিলাম। আমি গত টেস্টে তো ফার্স্ট হয়েছি। এবার একটু খারাপ করলাম। এতেই আম্মু এত বকা দিল।”
    “আচ্ছা, তোমার আম্মু কীভাবে তোমাকে বকা দিয়েছে। একটা অ্যাক্সাম্পল দেখাও তো। “- এ বলে বাবা ঠোঁট টিপে হাসতে লাগলেন।
    ত্বালহা কাঁদো কাঁদো গলায় জবাব দিল,
    “আব্বু, তুমিও না ভারী ইয়ে! আমার সাথে এখন দুষ্টুমি কোরো না তো! ”
    “আচ্ছা ঠিক আছে বাবা। যাও, আর দুষ্টুমি করব না।”
    এ সময় ত্বালহার মা রুমে ঢুকে তার টেবিলে এক গ্লাস দুধ রাখলেন। বললেন,
    “তাড়াতাড়ি খেয়ে নে! দশটার দিকেই ঘুমুতে হবে।”
    এ বলে চলে গেলেন। ত্বালহা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
    “দেখেছ আব্বু,  আম্মুর কী তেজ! ”
    “এতে তেজের কী হলো রে ত্বালহা? দুধ তো খাওয়ার জন্যেই।”
    “সেটা না তো। আম্মু আমাকে ‘তুই, তুই’ করছে!”
    “তো? ”
    “আম্মু আমাকে এম্নিতে ‘তুমি’ করে বলে। আজ রেগে আছে বলেই ‘তুই’ করে বলছে।”
    “আহহা রে! তুমি তোমার আম্মুর ছেলে না,  তোমাকে তুই ডাকবে না তো কি তোমার বন্ধুকে ডাকবে নাকি? আমার মাও তো আমাকে তুই ডাকত!”
    ত্বালহা কিছু না বলে তার অঙ্ক খাতার কভারে পেন্সিল দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে লাগল।
    বাবা বললেন,
    “তোমার আম্মু তোমাকে ‘তুই’ ডাকুক বা ‘তুমি’ ডাকুক, সে কিন্তু তোমাকে ভালোবাসে।”
    “তুমি একথা কেন ভাবছ আব্বু?”
    “তোমার আম্মু তোমার জন্যে অনেক ভালো ভালো খাবার রান্না করে। তোমার প্রিয় কার্টুনের সিডি কিনে দেয়। আবার তুমি সাদা দুধ পছন্দ করো না কিন্তু চকোলেট দুধ পছন্দ করো। এজন্যেই তো এখন চকোলেট দুধ আনল তোমার জন্যে।”
    ত্বালহা বিরক্তমুখে বলল,
    “এটাতে ভালোবাসার কী হলো আব্বু? সবার আম্মু-ই তো এমন করে। এটা তো স্পেশাল কিছু না। তাই না আব্বু?”
    ত্বালহার বাবা একটি ছোট নিঃশ্বাস ফেলে উঠে চলে গেলেন। ‘ভালোবাসা’ ব্যাপারটি কেমন এটাই ত্বালহা জানে না,  তাকে তাই কিছু বুঝানোটা নিরর্থক।

    ত্বালহা দুধ না খেয়ে গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছে। দুধের রঙ দেখছে। বাদামি রঙ। তার প্রিয় দুধ। কিন্তু কেন যেন এখনই খেতে মন চাচ্ছে না।তরল দুধের দিকে সে একমনে তাকিয়েই আছে।
    হঠাৎ সে খেয়াল করল গ্লাসের দুধগুলো কাঁপছে। আস্তে আস্তে কাঁপুনি বাড়তে লাগল।
    তখনই তার মা ছুটে এসে তাকে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত দরজার দিকে ছুটছে। ত্বালহা তো হতভম্ব! ব্যাপার কী!

    তার মা দরজা খুললে সে দেখতে পেল পাশের ফ্ল্যাটের অনেক আঙ্কেল-আন্টিরাও বের হয়ে গেছে তাদের বাচ্চাদের নিয়ে। ত্বালহার ভয় ভয় করতে লাগল।

    তার মা তাকে নিজের কোলে উড়না দিয়ে আড়াল করে রেখেছে। কিছুক্ষণ পর সে দেখল পাশের ফ্ল্যাটের নীলু আন্টি কান্ননাকাটি শুরু করে দিলেন। তাঁর কান্না দেখে উনার ছোট ছেলেটাও কাঁদতে লাগল।
    কিছুক্ষণ পর ত্বালহার মা নিজেও কাঁদতে লাগল। মায়ের কান্না আগে ত্বালহা কখনও দেখেনি। আজই প্রথম। তারও কান্না পেতে লাগল।
    কিছুক্ষণ পর ত্বালহার বাবা ঘর থেকে বের হলেন। তাঁর মুখ স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয়নি।
    তিনি সামনে এসে বললেন,
    “আপনারা ভয় পাচ্ছেন কেন?”
    নীলু আন্টির স্বামী তাঁকে বললেন,
    “বলেন কী ইসমাইল সাহেব!  আমরা ভয় পাব না!  ভূমিকম্প হলে ভয় পাব না!”
    “ভূমিকম্প আবার কখন হলো?!”
    “বলেন কী! একটু আগে পুরো বিল্ডিং যে কেঁপেকেঁপে উঠল,  এটা কি খেয়াল করেননি! নাকি ঘুমাচ্ছিলেন!”
    ত্বালহার বাবা হাসতে হাসতে বললেন,
    “অও আচ্ছা, সেটা!  ওটা তো ভাই ভূমিকম্পের জন্যে না।”
    “তাহলে কীসের জন্যে?”
    “আমাদের এলাকাতে একটা কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু হয়েছে আজ থেকে। ওখানেই ভারী ভারী নির্মাণসামগ্রী আনা হয়েছে। সেগুলো যখন সচল থাকে ও ব্যবহার করা হয়, তখন এর আশেপাশের বিল্ডিংগুলো কাঁপতে থাকে। এটাই ভাই, আর কোনো কিছু না।”
    ত্বালহার বাবার উত্তর পেয়ে অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন যেন। যার যার ঘরে সবাই চলে গেলেন।
    ত্বালহাকে তার মা কোলে করে সে অবস্থাতেই বাসায় নিয়ে এলেন এবং তার বিছানায় শুইয়ে দিলেন।
    “ত্বালহা,  আব্বু, ঘুমাও তুমি। আজ আর পড়তে হবে না।”
    এ বলে উড়নার আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তিনি অন্য ঘরে চলে গেলেন।
    এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর তার বাবা তার রুমে ঢুকলেন। ত্বালহার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসিহাসি মুখ করে রইলেন।
    ত্বালহা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
    “হাসো কেন আব্বু?”
    “কেন হাসছি বুঝতে পারছ না?”
    কিছুক্ষণ চুপ থেকে ত্বালহা জবাব দিল,
    “পারছি বাবা।”
    এ বলে গ্লাসের দুধ এক চুমুকেই সে খেয়ে নিল। দুধ খাওয়ার সময় সে মাথা উঁচু করেছিল। আর ঠিক তখন তার বাবা তার চোখে কোনো একটা তরল পদার্থের ঝিলিক দেখতে পেলেন, যা চোখ থেকে প্রায় গড়িয়ে পড়ছিল।

    ত্বালহার বাবা ইসমাইল সাহেব বুঝলেন, আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মায়ের মধ্যে  সন্তানের ভালবাসা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন, যা বাবাদের চেয়ে অনেক বেশি। তাই তো আজ তাঁর স্ত্রী ভূমিকম্পের আতঙ্কে ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়েই বাইরে ছুটে গেলেন।

    আমরা সকলেই মুখে বলি ‘আমি মাকে ভালবাসি’, কিন্তু কাজে প্রমাণ করি না। তাই মাঝেমাঝে আল্লাহ তা’আলা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে আমাদের এ সত্যটি বুঝিয়ে দেন, যা এবার ত্বালহাকে বুঝালেন।

    বি: দ্র: নিচের বিজ্ঞাপনের সাথে এই ব্লগসাইটের পরিচালনা পরিষদ কোনোভাবেই জড়িত নয়।

    একটি হাইপোথিসিস ও কিছু কথা

    image

    ছোটবেলায় আমরা সবাই এক কথায় প্রকাশে পড়েছি,
    ‘অল্প কথা বলে যে = অল্পভাষী।’

    কথা অল্প বলাটাই মূলত বিচক্ষণের কাজ। আবার সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলাটাও বুদ্ধিমানের দায়িত্ব।

    আমি ছোটবেলায় খুব কম কথা বলতাম, এখনো টুকটাক কম কথাই বলি বোধহয়।

    তবে ছোটবেলার সেই  কম কথা বলার গুণকে (!) ‘অল্পভাষী’ বললে ভুল হবে। কারণ তখন আমি কোনোভাবেই মুখ খুলতাম না। ব্যাপারগুলো ঘটত সম্পর্কের গভীরতা থেকে।

    যাঁদের সাথে সম্পর্ক গভীর ছিল না, তাঁদের কাছে আমি ছিলাম ‘অল্পভাষী’।

    কিন্তু এর মানে আবার এই না যে যাঁদের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক ছিল, তাঁদের কাছে আমি ‘বাচাল’।
    আমি তাঁদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতাম, হাসি-ঠাট্টায় অংশ নিতাম ইত্যাদি।

    এখন আমার মধ্যে যা এসেছে,  তা হল বন্ধুদের সাথে কথা বলা। তাঁরা হচ্ছেন ফেসবুক বন্ধু। তাঁদের অনেকের সাথে তো ইনবক্সে কথাবার্তা হয়-ই (‘চ্যাট’ বললাম না, কারণ অনেকের কাছে এটি নাকি একটু ভালগার শব্দ। অনেকেই একে নতুন শব্দ বলে। যদিও এর প্রথম ব্যবহার হয় ১৫শ শতকে। আর এটি মোটেও ভালগার শব্দ নয়। সূত্র: ইংরেজি অভিধান)।
    আবার এঁদের অনেকের সাথে সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পেলে মোবাইল ফোনে কণ্ঠালাপের সূচনা ঘটে।

    সে যাহোক, আমি এখন অটোবায়োগ্রাফি লিখছি না। নিজের কথা বলে বলে আর বিরক্তি বাড়াতে চাই না।

    আমার একটা হাইপোথিসিস ছিল। হাইপোথিসিস (Hypothesis) বলতে বোঝায় কোনো প্রাথমিক ধারণা।
    আমার হাইপোথিসিসটি ছিল যে, যেসব মানুষ কথা বলে কম, তারা লেখেন ভালো। একে আরো স্পষ্ট করে বললে, যেসব মানুষ কথা বলে কম বা যা বলতে চায় তা গুছিয়ে বলতে পারে না, তাদের লেখার ক্ষমতা খুব ধারালো।

    এই ধারণা আসার কারণ হলো,  আমি  আমার এমন কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বন্ধুদের দেখেছি যাঁরা লেখেন খুব ভালো।

    তাঁদের লেখার ক্ষমতা খুব জোরালো এবং সেগুলো চিন্তার উদ্রেককারী।

    এমন কয়েকজনের সাথে আমার সরাসরি যোগাযোগ হয় এবং মোবাইল ফোনে কথা হয়। আমি তখন খেয়াল করেছি যে এঁদের কয়েকজন যখন কথা বলেন, তখন তাঁদের মধ্যে তোতলানো একটি ভাব এসে যায়।
    উল্লেখ্য যে, তাঁরাও অল্পভাষীদের দলে রয়েছেন।
    (সবার কথা বলছি না, যাঁদের ব্যাপারে জানি তাঁদের ব্যাপারে বলছি। সবাই কিন্তু আবার তোতলায় না।)

    তো, এই অভিজ্ঞতা থেকেই এই ধারণার সূত্রপাত ঘটে।

    আমি তখন ভেবে দেখলাম যে, যাঁরা কথা বেশি বলেন বা কথা বলতে ভালোবাসেন, তাঁদের লেখার দক্ষতা কেমন?
    আমার ধারণা হল, তাঁদের লেখার দক্ষতা বোধহয় স্বল্পভাষীদের তুলনায় আরো ভালো হতে পারে।

    কিন্তু আমার নিজের এই ধারণা আমি নিজেই ভুল হিসেবে চিহ্নিত করে ফেললাম।

    আমি একটি ব্যাপার চিন্তা করলাম যে, কোনো একটি লেখা আমাদের কাছে কখন ভালো লাগে।
    আমাদের কোনো একটি লেখা তখনই ভালো লাগে, যখন সে লেখাটির প্রসঙ্গের সাথেসাথে এর বাচনকভঙ্গি, বাক্যবিন্যাস, প্রায় নির্ভুল বানানের শব্দ, আকর্ষণীয় কথামালা ইত্যাদিতে পূর্ণতা থাকে।
    বিশেষত, যাঁরা এসব ব্যাপারে জ্ঞানী, তাঁরা এসব দিক বিবেচনা করেই একটি প্রবন্ধ বা গল্পের মান মূল্যায়ন করেন।

    এখন একজন মানুষ চাইলেই সুন্দর বাচনভঙ্গি-বিশিষ্ট, প্রায় নির্ভুল বানান-বিশিষ্ট, সুশৃঙ্খল বাক্যবিন্যাস-বিশিষ্ট, আকর্ষণীয় কথামালা বিশিষ্ট প্রবন্ধ বা গল্প লিখতে পারেন না। এর জন্যে তাঁর কোনো না কোনো অনুপ্রেরণা লাগবেই।
    আমার মতে সেটি হলো বেশি বেশি প্রবন্ধ পড়া এবং বই পড়া।

    এখন এই লেখাকে সাহিত্যিক ও চলিত রীতির জনক প্রমথ চৌধুরীর লেখার কপি/পেস্ট মনে করে থাকলে ভুল করবেন। আমি হুমায়ুন আজাদ নই যে অন্য লেখকের বই অনুবাদ করে নিজের নামে চালিয়ে দিব।
    হ্যাঁ, তবে প্রমথ চৌধুরীর দু’টো প্রবন্ধ থেকে আমি যে অনুপ্রাণিত হই নি তা বলব না। দু’টোই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা আছে।
    তাঁর কথার সাথে আমার কথার পার্থক্যটুকু হচ্ছে যে, তিনি মানুষকে বই পড়তে উদবুদ্ধ করেছিলেন; আর আমি অল্পভাষীরা কেন ভালো লেখে এর কারণ বের করার চেষ্টা করছি।

    ভালো বই পড়লে মানুষের জ্ঞানের বিকাশের সাথেসাথে তার মস্তিষ্কে বিভিন্ন শব্দ, যা সে আগে জানত না ইত্যাদির মজুদ হতে থাকে।
    তাছাড়া বাক্যের বিন্যাস, বাচনভঙ্গি ইত্যাদিও সে শেখে।
    ক্রমাগত বই পড়লে সে যে ভাষার বই পড়ছে, সেই ভাষার প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে, জানার ইচ্ছা বাড়ে, জানার ইচ্ছা থেকে সে আরো বেশি বেশি পড়তে আগ্রহী হয়, এভাবেই তার ভাষাগত জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।

    প্রবন্ধ বা Article লিখতে হলে ভাষাগত জ্ঞান, বানানগত জ্ঞান, এবং সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন ব্যাক্রণিক জ্ঞানের প্রয়োজন হয় খুব বেশি।

    তবে লেখালেখির ধরণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন লেখক, সাহিত্যিক বা প্রাবন্ধিকের অবদান থাকে।

    আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে এই ব্যাপারটি জেনেছি। তার আরেক বন্ধু আছে যে হুমায়ূন আহমেদের লেখার বড় ভক্ত। সে নাকি হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সকল লেখাই পড়ে ফেলেছে।
    তাঁর গল্প-উপন্যাস পড়ার পর সে নিজেই বিভিন্ন গল্প লিখতে লাগল। আমার বন্ধু সেগুলো পড়ে আবিষ্কার করল যে তার লেখার মধ্যে তার প্রিয় লেখকের লেখার ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট।

    আসলে এটিই স্বাভাবিক। কেউ শুধু একজনের কাছ থেকে শিখলে তার মধ্যে সেই একজনের বৈশিষ্ট্যগুলোই ফুটে ওঠবে।

    কিন্তু অনেকজনের কাছ থেকে শিখলে তার মধ্যে হয়ত অনেকজনের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠবে, কিন্তু কখনোই শুধু একজনের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠবে না।

    সে যাহোক, অনেক আজেবাজে কথাই বলে ফেললাম। মূল প্রসঙ্গ থেকে কী ছিটকে বেরিয়ে গেছি? অনেকাংশে বেরিয়ে গেছিই বলে মনে হচ্ছে।

    আমার নিজের হাইপোথিসিস-ই আমার কাছে ভুল প্রমাণিত হল। বেশি কথা বলা, কম কথা বলা; এসব দিয়ে যাচাই করাটা অযৌক্তিক যে সে ভালো লেখে কি লেখে না।
    আরে অনেকে তো কথাই বলতে পারেন না। অথচ বড় বড় বই লিখে ফেলেছেন। যেমন- স্টিফেন হকিংস। স্টিফেন হকিংস-এর ব্যাপারে সবাই মোটামুটি কিছু না কিছু জানি, না জেনে থাকলে উইকিপডিয়া থেকে জেনে নিবেন।

    তবুও বলে রাখি যে তিনি একজন বিজ্ঞানী এবং প্রতিবন্ধী। তিনি কথাও বলতে পারেন না। মনের ভাব প্রকাশ করেন একটি কম্পিউটারের মাধ্যমে। 

    তবে তিনি বিজ্ঞানের অনেক বড় বড় বই লিখে গেছেন যেমন, A Brief History of Time,  Grand Design. ইত্যাদি।

    তিনি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞানের কিছু অগ্রযাত্রায় বই লেখার মাধ্যমে অবদান রাখতে পারছেন কীভাবে?

    এর একটাই উত্তর, তিনি প্রচুর বিজ্ঞানের বই পড়েছেন যা তাঁকে এসব বই লিখতে সহায়তা করেছে।
    হ্যাঁ, তাঁর নিজের বহু অবদান অবশ্যই আছে। তবে বাড়ির ছাদে উঠার জন্যে সিঁড়ি থাকে যাতে নিজের চেষ্টাতেই উঠতে হয়, এখানে সিঁড়ি আর ব্যক্তি উভয়ই একসাথে কাজ করে।

    তো বই পড়ার মাধ্যমে যে লেখালেখির অভ্যাস ফুটে উঠে, এই ধারণার পক্ষে তো কিছু বললাম।

    তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়।

    শুধু বইপোকা হলেই যে সে ভালো লেখালেখি করতে পারবে, এ ধারণা ভুল। এর জন্যে লেখালেখির চর্চার প্রয়োজন।
    শুধু একজনের বই পড়েই নিজেকে ‘বইপোকা’ মনে করাটাও কিন্তু ভুল।

    ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলি। আমার সাহিত্য পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ার মাধ্যমে। তাঁর প্রচুর বই পড়েছি।
    তাঁর  গল্প-উপন্যাস, আত্মজীবনী, ভ্রমণসমগ্র ইত্যাদি পড়ার পর আমার মাথায় ঢুকে গেল আমি একজন ‘বইপোকা’। আর এ উপাধিতে নিজেকে সম্বোধন করতেও খুব আনন্দ হতে লাগল।

    হুমায়ূন সাহেবের বই পড়ার পর আমি ভাবলাম অন্য কারো বই পড়া যাক। হাত দিলাম জহির রায়হানের গল্পের দিকে। দু-তিন পৃষ্ঠা পড়ার পর কেমন যেন বিরক্তি লাগা শুরু করলো।
    জহির ছেড়ে পা ডুবালাম হুমায়ূন আজাদের ভাষাবিষয়ক প্রবন্ধে। লেখকের প্রতি পূর্ব বিতৃষ্ণা থাকায় কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই ইতি টানলাম।
    এরপর শওকত ওসমানের সাহিত্যে নাক ডুবানোর চেষ্টা করলাম। কেন যেন তাঁর সাহিত্য আমাকে আকর্ষণ করলো না।

    এমন কেন হচ্ছে এটা নিয়েই ভাবতে লাগলাম। ভাবলাম যে,  আমি একজন ‘বইপোকা’, অথচ বইয়ের প্রতিই আমার এত অনীহা কেন।

    হুমায়ূন আহমেদের না পড়া আরেকটি বই হাতে নিলাম। কী আশ্চর্য! এক বসাতেই ৭০ পৃষ্ঠা পড়া শেষ করে ফেললাম!

    শেষে বুঝলাম, আমি মোটেও কোনো বইপোকা-ফইপোকা নই। আমি যা,  তা অনেকেই। আমি ছিলাম ‘হুমায়ূন-সাহিত্যখোর’।

    শুধু একজনের সাহিত্য নিয়েই পড়ে ছিলাম বলে আজ আমার এ অবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে যদি কখনো আমি কিছু লিখি, তাহলে তাতেও ফুটে উঠবে হুমায়ূন সাহেবের লেখার ছাপ। যেহেতু আগেই বলেছি যে লেখালেখির ধরনেও সাহিত্যিকদের অবদান থাকে।

    ভক্ত হতে আমার কোনো অসুবিধা নেই, অসুবিধা আছে অন্ধভক্ত হতে।  আরো অসুবিধা আছে অন্যের নকল করতে।

    লেখালেখির দক্ষতা বাড়ানোর জন্যে লেখালেখির চর্চার যেমন প্রয়োজন, আরো প্রয়োজন সে যে ভাষায় লিখছে সে ভাষা-বিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞান রাখা।
    সাথেসাথে আরো প্রয়োজন সে ভাষার বানানের ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়া।

    ইংরেজি ভাষায় কেউ যদি কিছু লিখে, এবং তাতে যদি ব্যাকরণ এবং বানানবিষয়ক ভুলত্রুটি থাকে,  তবে পাঠকের আপত্তির অন্ত থাকে না।

    তারা মন্তব্য করে বসে, 

    “If you don’t have the knowledge of English  grammar as well as spelling, then please don’t write in this language. And please don’t insult this international language by writing such kind of garbage things.”

    কিন্তু বাংলা ভাষায় যেসব লেখালেখি হয়,  তাতে যে অসং্খ্য ভুলভ্রান্তি থাকে সেদিকে বোধহয় অনেকেই নজর দেন না।
    নজর দেওয়ার জন্য যে কিছু জ্ঞানের প্রয়োজন, তাও অনেকের নেই।

    বাংলা ভাষা তাই অবহেলিত। এই ভাষায় ভুল করলে তাতে কারো কিছু যায় আসে না, কারণ এটি ‘মাতৃভাষা’,  ‘আন্তর্জাতিক ভাষা’ নয়।

    যাহোক, আর কথা না বাড়াই। বহু অগোছালো কথা বললাম। উপরের লেখাগুলো ছিল বহু অগোছালো লেখার সংকলন।

    নিজের সেই হাইপোথিসিস নিজেই ভুল প্রমাণ করলাম। একেই কি বলে আত্মসমালোচনা?
    না,  একে আত্মসমালোচনা বলে না। কারণ এই হাইপোথিসিস এখন আমি আর বিশ্বাস করি না।
    আশা করি আপনারাও এতে অবিশ্বাস করে আমার সাথে সহমত হবেন।

    শেষ কথা:
    নিজের কলমকে বলিষ্ঠ করুন এবং মানুষের কল্যাণে এর ব্যবহার করুন।

    বি: দ্র: নিচের বিজ্ঞাপনের সাথে এই ব্লগসাইটের পরিচালনা পরিষদ কোনোভাবেই জড়িত নয়।

    ভাই/আপু এই লেখাটা তোমার জন্যে

    আশা করি এই লেখাটি তোমার চোখ খুলে দিবে। সবকিছু নতুন করে ভাবতে সহায়তা করবে। লেখাটি খুব মনোযোগ সহকারে শেষ পর্যন্ত পড়ার আন্তরিক অনুরোধ রইল। জাযাকাল্লাহ খাইরান।

    বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম                    
    তোমাকে প্রথমেই একটা কথা বলে রাখি, আমি খুব বিষণ্ণ মন নিয়ে এই লেখাটা লিখতে বসেছি। তবে এই বিষণ্ণতা তথাকথিত গার্লফ্রেন্ড চলে যাওয়ার বিষন্নতা নয় বা এই পৃথিবীতে কোনোকিছু হারানোর বিষণ্ণতা নয়।
    এই বিষণ্ণতা তোমাকে এই কথাগুলো আগে বলতে না পারার অযোগ্যতার বিষণ্ণতা,আমাদের চারিপাশে যা কিছু হচ্ছে তা সইতে না পারার বিষণ্ণতা।
    সবাই যখন পরীক্ষার পড়াশোনা নিয়ে খুব ব্যস্ত আমি তখন তোমাকে লিখতে বসেছি কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে আমার এই পরীক্ষার চেয়ে তোমাকে এই কথাগুলো বলা বেশী প্রয়োজন, বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
    হয়ত আমার এই কথাগুলো তোমার ভালো নাও লাগতে পারে, তারপরেও লিখলাম শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে।
    প্রারম্ভিক কিছু কথাঃ
    কী সুন্দর এই পৃথিবী! চোখ জুড়ানো বিস্তীর্ণ শ্যামল শস্য ক্ষেত। গাছের ডালে ডালে রঙ-বেরঙের ফুল ও ফল, তারই মাঝে রঙ-বেরঙের পাখ-পাখালি  ও প্রজাপতির মনভুলানো খেলা।
    মন জুড়িয়ে যায়। মন জুড়িয়ে যায় বিরাট খোলা আকাশটার দিকে তাকিয়ে। মেঘের কোলে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বাধীন ডানা মেলা পাখিরা, রোদ হাসছে ঝিকমিক।
    কি সুন্দর! কি সুন্দর এই সৃষ্টি! কি বিরাট বিস্ময়কর এই সৃষ্টি! সৃষ্টির এই সৌন্দর্য উপভোগ করে শেষ করা যায় না। এর সীমা-সংখ্যা গুনে শেষ করা যায় না।
    বিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু মেনে চলেছে আল্লাহর আইন। এই শৃংখলার কোন ব্যতিক্রম নেই। আর এ জন্যেই এই বিশ্বজগত এতো সুন্দর।
    বিরাট এ বিশ্বজগতে বিরাজ করছে অনাবিল শান্তি, ঐক্য আর শৃংখলা।
    কে না চায় এই এতো সুন্দর বিশ্বজগতে বেঁচে থাকতে!!

    মানুষ এই দুনিয়ার সুন্দরতম সৃষ্টি। আশরাফুল মাখলুকাত বলা হয় তাকে। অন্যান্য সৃষ্টি থেকে আলাদা তার মর্যাদা। বিশেষ তার স্থান। মানুষ এই দুনিয়ায় আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি, আল্লাহ্‌ মানুষকে দিয়েছেন জ্ঞান-বিবেক, দিয়েছেন ভালো মন্দ বুঝার ক্ষমতা।
    সে যেমন এই জ্ঞানের আলোকে ভালো কাজ করতে পারে তেমনি রয়েছে খারাপ কাজ করার তার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা।

    কিন্তু কেন আল্লাহ্‌ তায়ালা মানুষকে এই বিশেষ মর্যাদা দিলেন? কেন দিলেন এমন স্বাধীনতা? এর পিছনে রয়েছে আল্লাহর এক মহান উদ্দেশ্য।
    তা হলো, বিশ্ব প্রকৃতির অন্যান্য সৃষ্টি যেমন আল্লাহর নিয়ম মেনে তৈরি করেছে অনাবিল শান্তির জগত তেমনি মানুষ তার স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও যেন আল্লাহ্‌র পথকে বেঁচে নিতে পারে।
    খারাপ কাজ করার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও যাতে করে সে নিজের ইচ্ছায় আল্লাহর আইনের গোলামীকে বরণ করে নিতে পারে।
    আর তারই ফলে তাদের জীবনে নেমে আসবে অনাবিল শান্তি। পৃথিবীতে গড়ে উঠবে এক সুন্দর শান্তিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা। আর আখেরাতের অশেষ পুরষ্কার তো রয়েই গেছে।

    এবার আসি মূল কথায়ঃ-

    ১)

    তোমার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি?
    পড়াশুনা করেছি কিন্তু স্কুল জীবনে “Aim in life বা জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য” নিয়ে রচনা লিখি নি বা পড়ি নি এমন একজনও খুঁজে পাওয়া যাবেনা।
    আমরা প্রত্যকেই মুখস্ত কিছু কথা লিখেছি যে, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। ডাক্তার হয়ে বিনামূল্যে মানুষের চিকিৎসা করে মানুষের সেবা করতে চাই।
    কেউবা আবার লিখেছি শিক্ষক হয়ে সমাজকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চাই।
    আবার কেউবা লিখেছি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। কিন্তু একবার চিন্তা করে দেখতো যে ছেলেটা ডাক্তার হতে চেয়েছিল সে আজ হয়ত পড়ছে ইতিহাস বা বাংলা বা ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে।
    যে ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিল সে হয়ত আজ পড়ছে প্রানীবিজ্ঞান বা উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়ে বা অন্য যেকোনো বিষয়ে।
    আর যে ছেলেটা শিক্ষক হতে চেয়েছিল তারহয়তোবা স্কুলের গণ্ডি পেরোনই হয় নাই।
    আসলে বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর। একজনকে যদি দান করে শতজনকে করে বঞ্চিত।

    আজ তোমার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। এখন আর ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করা বা শিক্ষক হয়ে সমাজকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা তোমার জীবনের উদ্দেশ্য নয়।
    তোমার দরকার কাড়ি কাড়ি টাকা-পয়সা, অর্থ-বিত্ত-প্রাচুর্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি।
    তোমার দরকার সমাজের বাহবা। সমাজ তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে, তোমাকে দেখে চেয়ারটা ছেড়ে দিবে, সমাজ তোমাকে স্বীকৃতি দিবে তুমি জীবনে সফল(?), সমাজ বলবে তুমি তোমার বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল করেছো, এগুলোই হচ্ছে এখন তোমার একমাত্র চাওয়া।
    আর একটা সুন্দরী রমণীর সাথে প্রেম করা বা বিয়ে করার বাসনা সেটা তো তোমার মনের ভিতরে সবসময়ই কাজ করে।
    তোমার দরকার বড় বড় সার্টিফিকেট, পি এইচ ডি ডিগ্রী যাতে বিয়ের বাজারে তোমার কদর একটুবেশীই থাকে।
    তুমি স্বীকার না করলেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এগুলোই যে তোমার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা তুমি অস্বীকার করতে পারবেনা।
    হয়ত বলবে এগুলো কে না চায়? হ্যা আমিও জানি এগুলো প্রায় সবাই চায়।তাই তুমিও চাও, মনেপ্রাণে চাও, যেকোনো মূল্যে চাও।
    আর তুমি তোমার এই চাওয়াগুলোকে পূরন করার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা সাধনা করে চলেছ।
    যে তুমি তোমার আরামের ঘুমটুকু ভেঙ্গে ফজরের নামাজটুকু পড়তে পারোনা সেই তুমি পরীক্ষার টেনশনে সারারাত ঘুমাতে পারোনা।
    কখন কিভাবে ভোর হয়ে যায় তুমি বলতেই পারোনা কিন্তু তোমার পড়া শেষ হয় না আর ফজরের দুই রাকাত ফরজ নামাজ পড়ারও সময়তো এমনেই হয়না।
    বই নিয়ে, গ্রুপস্টাডি নিয়ে বন্ধুদের সাথে এতোটাই ব্যস্ত থাক যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার জন্যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিরিশ মিনিট সময় তোমার হয়না।
    কারণ তুমি জান যে এবং তোমাকে জানানো হয়েছে যে এই পরীক্ষায় তুমি ভালো করতেই হবে, না করতে পারলেতোমার স্বপ্নগুলো পূরন হবে না।
    এই পরীক্ষায় ভালো না করতে পারলে তোমার একটা আরাম আয়েশি জীবন, একটা সুন্দর বাড়ি, একটা সুন্দরী নারী এবং একটা সুন্দর গাড়ী পাওয়া হবে না।আর এগুলো না ফেলে তোমার জীবন একেবারে ব্যর্থ।
    সমাজ তোমাকে ব্যর্থদের কাতারে ফেলে দিবে, সমাজ তোমার কুৎসা করবে, সমাজ বলবে তুমি শেষ, তুমি কোন কাজের না, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।
    তাই তুমি পাগলের মত ছুটে চলেছ এসবের পেছনে। কিন্তু তুমি একবার ভাব নি তুমি কিসের পেছনে ছুটছো, কিসের জন্যে ছুটছো।অবশ্য তা ভাবার মত তোমার সময় কোথায়?

    ক)

    মনে করো তুমি পরীক্ষা দিয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছ এবং দুই দিন পরে ডিপার্টমেন্টের টিচার হবে কিন্তু কিছু দিন পরেই তুমি মারা গেলে।
    এখন বল কি হবে তোমার ওইসব ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট সার্টিফিকেট দিয়ে। কেজির দরে বিক্রি করা ছাড়া আর কোন কাজে আসবেনা।
    আর কেজির দরে বিক্রি করলেওতো দুই টাকার বেশী হবে না। এখন চিন্তা করো তোমার সারা জীবনের অর্জন তোমার মৃত্যুর সাথে সাথেই দুই টাকা হয়ে গেল বা তারও কম।

    খ)

    মনে করো গুলশানে তোমার একটা বিশাল বাড়ী হল এবং বাড়ীটিতে উঠার একদিন পরেই তুমি মারা গেলে কি হবে তোমার এই বাড়িটার?
    মনে করো তোমার একটা লাখ টাকা বেতনের একটা চাকরি হল এবং একটা গাড়ী হল এবং তুমি ওই গাড়ীতে করে প্রথম দিন অফিসে যাওয়ার পথেই দুর্ঘটনায় মারা গেলে তখন কি হবে তোমার ওই লাখ টাকার চাকরি আর বিলাসবহুল গাড়ীর?
    আচ্ছা মনে করো খুব সুন্দরী একটা মেয়ের সাথে তোমার বিয়ে হল এবং বাসর রাতের পরের দিনই তুমি মারা গেলে তখন কি হবে তোমার ওই সুন্দরী স্ত্রীর?

    এগুলো কি তোমার সাথে কবরে নিয়ে যাবে নাকি? নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা তুমি মারা যাওয়ার পর তোমার ওই ভালোবসার মানুষটিই ভয়ে তোমার সাথে একরাত থাকতেও চাইবেনা।
    তোমার যে স্ত্রী কখনো তোমাকে ছাড়া একরাত থাকতে পারতো না, তোমার সেই স্ত্রীই বলবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাকে যেন দাফন করা হয়।
    এটাই চরম বাস্তবতা এবং এটাই চরম সত্য।

    একবারভেবে দেখ তোমার মৃত্যুর সাথে সাথেই তোমার সব বৈষয়িক অর্জন, প্রভাব-প্রতিপত্তি সব কিছু এক মুহূর্তের মধ্যে শূন্য হয়ে যাবে। তোমার অতি কাছের মানুষগুলো চিরদিনের জন্যে তোমার পর হয়ে যাবে।
    যাদের জন্যে তুমি পৃথিবীতে এতো কিছু করেছো কেউ তোমার সামান্য উপকারে আসবেনা।
    কেউ তোমাকে বিন্দু পরিমাণ সাহায্য করতে পারবেনা এমনকি তোমার গর্ভধারিণী মাও পর্যন্ত তোমার জন্যে কিছু করতে পারবেনা এক দোয়া করা ছাড়া।
    আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেনঃ-

    “আর ভয় করো সেই দিনকে যেদিন কেউ কারো সামান্যতম উপকারে আসবেনা, কারো পক্ষ থেকে কোন সুপারিশ গৃহীত হবেনা এবং বিনিময় নিয়েও সেদিন কাউকে ছেড়ে দেওয়া হবেনা।”
    -সুরা আল বাকারাঃ৪৮

    তাহলে এখন ভাবো কি নিয়ে যাবে তোমার সাথে যেটা তোমাকে সেদিন সাহায্য করবে যেদিন কেউ তোমাকে সাহায্য করতে পারবেনা।
    শুধুমাত্র একটা জিনিসই তোমাকে সাহায্য করতে পারবে সেটা হচ্ছে তোমার আমল অর্থাৎ তোমার কৃতকর্ম।
    আর সেটাকে গুরুত্ব না দিয়েইতো তুমি এসবের পিছনে পাগলের মত ছুটে চলেছ।
    তাহলে তখন্ তোমার কি অবস্থা হবে একবার ভাব।
    অবশ্য তোমাকে ভাবতে হবে না কারণ সেটা আল্লাহ্‌ তায়ালাই তোমাকে সতর্ক করার জন্যে পবিত্র কোরআনে বার বার বলে দিয়েছেন।
    কিন্তু তুমি এতটাই দুর্ভাগা যে সেই সতর্ক বাণীগুলো তোমার কানে পৌঁছায় না বা নিজে জানারও প্রয়োজনবোধটুকু করোনা।

    আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেনঃ-

    “আর যার আমলনামা তার বামহাতে দেয়াহবে সে বলবেঃহায়! আমার আমলনামা যদি আমাকে আদৌ দেয়াই না হতো এবং আমার হিসেব যদি আমি আদৌ না জানতাম তাহলে কতই না ভাল হত৷
    হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো।আজ আমার অর্থ-সম্পদও কোন কাজেই আসলো না৷আমার সকল ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বরবাদ হয়ে গেল।
    –সুরা আল হাক্কাহঃ ২৫-২৯

    এখন ভাবো কি হওয়া উচিত তোমার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আবারো ভাবো!!!।
    এই দুনিয়ার প্রতিপত্তি নাকি আখিরাতে মুক্তি।

    ২)

    আচ্ছা বলতো কেন তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তুমিতো এই পৃথিবীর সামান্য কিছু বৈষয়িক সুখের জন্যে হাজার হাজার পৃষ্টা পড়ে চিন্তা করতে পারো, লিখতে পারো, বলতে পারো কিন্তু কখনো কি একবার ভেবে দেখেছো যে কেন তোমাকে তোমার প্রভু সৃষ্টি করেছেন?
    শুধুমাত্র কি এই জন্যে যে তুমি তুমি জন্ম নিয়ে ছোট থেকে বড় হবে, পড়াশুনা করবে, তারপর একটা ভালো চাকরি করবে, তারপর বিয়ে করে সুখে শান্তিতে সংসার করবে, তারপর বৃদ্ধ হবে এবং তারপর একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে? অনেকটা পশু পাখির মতই।
    তাহলে তুমি যে আশরাফুল মাখলুকাত এই কথার সত্যতা থাকল কোথায়?
    আচ্ছা একবার গভীরভাবে চিন্তা করো তো যিনি এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা, অসীম জ্ঞানী, যার সৃষ্টিতে কোন ভুল বা ত্রুটি নেই সেই তিনি কীভাবে তোমাকে এতো বুদ্ধি, বিবেক, প্রজ্ঞা দিয়ে সুন্দরতর আকৃতিতে সৃষ্টি করে কোন কারণ বা উদ্দেশ্য ছাড়াই এই পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন?
    তুমি হয়ত জানো না বা জানবার প্রয়োজনীয়তাটুকুও বোধ করোনা কেন আল্লাহ্‌ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।
    কিন্তু সেটা আল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন।

    আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেনঃ-

    “আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য সৃষ্টি করিনি।”
    -সুরা আয যারিয়াতঃ ৫৬

    উপরের আয়াতটা বার বার পড় এবং দেখতো বুঝতে কোন অসুবিধা হয় কিনা, কী কারণে আল্লাহ্‌ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।
    আমি জানি একটা ছোট শিশুরও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না।অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ তায়ালা তোমাকে এতো বুদ্ধি, বিবেক, প্রজ্ঞা দিয়ে সুন্দরতর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তার অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতের জন্যে।

    এখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমি কি তাহলে  এই পৃথিবীর কিছুই পাবো না বা কিছুই ভোগ করতে পারবো না বা অন্য কোন কিছুই করতে পারবো না?
    অবশ্যই পারবে, সব কিছুই করতে পারবে। তবে সেটা আল্লাহ্‌ ও তার রাসুলের দেখানো পথে হতে হবে।
    আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের দেখানো পথে তুমি যা করবে বা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের নিষেধে যা পরিত্যাগ করবে তার সবটাই ইবাদত।
    যদি তুমি আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশমত রাস্তা দিয়ে হাঁটো এবং আল্লাহ্‌ তাঁর রাসুলের আদেশমত রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাক তাহলে রাস্তা দিয়ে হাঁটাটাও তোমার জন্যে ইবাদত বলে গন্য হবে যেমনিভাবে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের দেখানো পদ্ধতিতে নামাজ পড়া, রোজা রাখা, যাকাত আদায় করা, হজ্জ করা ইবাদত হিসেবে গন্য হয়।
    তুমি যদি সৎ পথে তোমার পরিবারের জন্যে জীবিকা নির্বাহ করো তাহলে সেটাও তোমার জন্যে ইবাদত হিসেবে গন্য বা কবুল হবে।
    এমনকি তুমি তোমার স্ত্রী বা স্বামীর সাথে যে সময়টুকু কাটাবে সেটাও ইবাদত বলে গন্য হবে যদি সেটা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের দেখানো পথ অনুসারে হয়।
    এমনকি তোমার ঘুমটাও ইবাদত হবে যদি সেটা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশিত পন্থায় হয়।

    রাসুল (সাঃ) বলেনঃ-

    “যে ব্যক্তি ইশার নামাজ জামাতের সাথে পড়ল যে যেন অর্ধরাত অবধি নামাজ আদায় করল। আর এর পর যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করল সে যেন সারা রাত নামাজ আদায় করল। অর্থাৎ মাঝখানে তার ঘুমটাও নামজের মত ইবাদত হিসেবে গন্য হবে।”
    (সহীহ মুসলিম ৩)

    কেন তুমি আশরাফুল মাখলুখাত?
    তুমি ইসলাম সম্পর্কে খুব ভালো না জানলেও অন্তত এটুকু জানো যে মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা তোমাকে আশরাফুল মাখলুখাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।
    কিন্তু কখনি কি একবার ভেবে দেখেছো কেন তুমি সৃষ্টির সেরা।
    নাকি এম্নিএম্নি তুমি সৃষ্টির সেরা!!
    এটা বলা কি চরম নিরবুদ্ধিতা না বল?
    তুমি নিজেও কি অন্য কাউকে শুধু শুধু সেরা বলে বলে মেনে নিবে?
    তুমি জানো যে তোমার বাবা তোমার পরিবারের শ্রেষ্ঠ কারণ তোমার বাবা তোমার পরিবাবের সকল দায়িত্ব বহন করেন।
    তেমনিভাবে তোমাকে কিছু দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে যেটা অন্য কোনো প্রানীকে দেয়া হয় নাই আর সে জন্যেই তুমি আশরাফুল মাখলুখাত  বা সৃষ্টির সেরা।

    আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেনঃ

    “ তোমরা হলে উত্তম জাতি। তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যান সাধনের জন্যে। তোমাদের কাজ হল, তোমরা মানুষকে সত্যের পথে চলার আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে।”
    -সুরা আল ইমরানঃ ১১০

    দেখ আল্লাহ্‌ কত স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন কেন তোমাকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।
    এখন বল এই দায়িত্ব পালন না করলে কি তুমি আর শ্রেষ্ঠ থাকবে বা থাকতে পারবে?
    থাকতে পারবেনা।
    তাহলে কি হবে তোমার অবস্থান?
    সেটাও কিন্তু আল্লাহ্‌ তায়ালা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেনঃ

    “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম আকৃতিতে। অতঃপর থাকে নামিয়ে দিয়েছি নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর অবস্থানে।”
    – সুরা আত ত্বীনঃ ৪-৫

    অর্থাৎ তুমি যদি তোমার এই দায়িত্বমানে “সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ” পালন না করো বা পালনে অবহেলা করো, তাহলে তোমাকে এক নিকৃষ্ট স্তরে নামিয়ে দেয়া হবে। অর্থাৎ পশু পাখিরও নীচের স্তরে।
    এখন একটু চিন্তা করতো তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা সম্পর্কে কতটুকুই বা জানো কতটুকুই বা পালন করছো।
    যদি না করে থাক তাহলে তোমার অবস্থানটা কি পশুর চেয়েও নীচে নেমে গেলনা?

    )

    আচ্ছা বলতো কেন আমরা বেঁচে আছি?
    আচ্ছা ভাইয়া বা আপু কখনো কি একবার চিন্তা করেছো কেন আমরা বেঁচে আছি? কিসের জন্যে বেঁচে আছি?
    খাবো-দাবো, সেক্স করবো, আমোদ-ফুর্তি করবো শুধু কি এই জন্যেই বেঁচে আছি?
    যদি শুধুমাত্র খাওয়া-দাওয়া, সেক্স, আমোদ-ফুর্তি বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হয় তাহলে তো আমাদের আর পশু পাখির মধ্যে কোন পার্থক্যই থাকলোনা।
    বরং তখন পশু পাখির জীবনটা আমাদের চেয়ে অনেক সুন্দর হবে কারণ ওদের খাওয়া-দাওয়া, সেক্সের জন্যে অতটা পরিশ্রম করতে হয় না যতটা করতে হয় মানুষের।
    যদি বল খাওয়া- দাওয়া, সেক্স, আমোদ- ফুর্তিই বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য না তাহলে কেন আমরা বেঁচে আছি সেই কারণটা অবশ্যই তোমাকে বের করতে হবে।
    আর এই জন্যে তোমাকে ফিরে যেতে হবে আল কোরআনের ছায়াতলে। না হলে হাজার হাজার পৃষ্টা পড়েও অন্ধকারে হাতড়িয়ে মরবে কিন্তু বেঁচে থাকার সঠিক উদ্দেশ্যটাই আবিষ্কার করতে পারবেনা।

    আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেনঃ

    “এই সেই রমজান মাস, যে মাসে কোরআন নাযিল করা হয়েছে; যা মানুষের জন্যে হেদায়াত স্বরূপ, যা এমন স্পষ্ট উপদেশে পরিপূর্ণ যে, তা সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য পরিস্কারভাবে তুলে ধরে।”
    – (সুরা আল বাকারাঃ ১৮৫৫)

    এই দুনিয়ার সাফল্যই কি প্রকৃত সাফল্য?
    আচ্ছা এই দুনিয়ার সাফল্যই কি প্রকৃত সাফল্য?
    এই দুনিয়াতে অঢেল টাকা-পয়সা, গাড়ী-বাড়ী, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং সুন্দরী রমণী পাওয়াটাই কি প্রকৃত সাফল্যের মূল নিদর্শন?

    দেখা যাক এই দুনিয়ার সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা এই দুনিয়ার তথাকথিত সাফল্য নিয়ে কি বলেনঃ

    “তারা তাদের এই দুনিয়ার জীবনে যা কিছু ব্যয় করছে তার উপমা হচ্ছে এমন বাতাস যার মধ্যেআছে তূষার কণা৷
    যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে তাদের শস্যক্ষেতের ওপর দিয়ে এই বাতাস প্রবাহিত হয় এবং তাকে ধ্বংসকরে দেয়৷আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেন নি৷ বরং প্রকৃতপক্ষে এরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে৷
    পার্থিব জীবন ছলনাময় সম্পদ ছাড়া কিছুই নয়।”
    – (সুরা আল ইমরানঃ১১৭)

    “পার্থিব জীবন ছলনাময় সম্পদ ছাড়া কিছুই নয়।”
    -(সূরা আলে ইমরানঃ ১৮৫)

    “পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত কিছু নয়,যারা সংযত হয় তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেষ্ঠতর। তোমরা কি তা বোঝ না?”
    -(সূরা আল-আন’আমঃ ৩২)

    “এই পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়। পরলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন।”
    -(সূরা আল-আনকাবূতঃ ৬৪)

    “এই পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু এবং পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস।”
    -(সূরা আল-মু’মিনঃ ৩৯)

    “তোমরা জেনে রেখো,পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক,জাঁকজমক,পারস্পরিক গর্ববোধ ও ধন-জনে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছু নয়।”
    -(সূরা আল-হাদীদঃ ২০)

    উপরের আয়াতগুলো বার বার পড় আর চিন্তা করো কিসের পেছনে পাগলের মত ছুটছু।

    ৪)

    আখিরাতের সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য।এই দুনিয়ার সাফল্য সে প্রকৃত সাফল্য নয় এই কথাতি বুঝতে বা উপলব্ধি করতে কোন বিবেকবান মানুষেরই অসুবিধা হওয়ার কথা না।
    কেননা এই দুনিয়ার সাফল্য নশ্বর, অস্থায়ী। এই দুনিয়ার সাফল্য আজ আছে তো কাল নেই। যেকোনো মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
    প্রকৃতপক্ষে আখিরাতের সাফল্যই যে প্রকৃত সাফল্য যে কেউ সামান্য একটুচিন্তা করলেই বুঝতে পারবে।
    কেননা আখিরাতের সাফল্য অবিনশ্বর, চিরন্তন। তা কখনো হারিয়ে যাবার নয় বা ধ্বংস হবার নয়।

    আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেনঃ

    “অবশেষে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই মরতে হবে এবং তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন নিজেদের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে।
    একমাত্র সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে,যে সেখানে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে ৷
    আর এ দুনিয়াটা তো নিছক একটাবাহ্যিক প্রতারণার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।”
    -(সুরা আল ইমরানঃ১৮৫)

    “সে সময় যাকে তার আমলনামা ডান হতে দেয়া হবে, সে বলবেঃ নাও,তোমরাও আমার আমলনামা পড়ে দেখো,আমি জানতাম,আমাকে হিসেবের সম্মুখীন হতে হবে। তাই সে মনের মত আরাম আয়েশের মধ্যে থাকবে সুউচ্চ মর্যাদার জান্নাতে।
    যার ফলের গুচ্ছসমূহ নাগালের সীমায় অবনমিত হয়ে থাকবে।
    এসব লোকদের কে বলা হবেঃ অতীত দিনগুলোতে তোমরা যা করে এসেছো তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তির সাথে খাও এবং পান করো।”
    – (সুরা আল হাক্কাহঃ ১৯-২৪৭)

    এবার তোমাকে কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলি।
    এবার তোমাকে কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলি। হয়ত তোমার কাছে কথাগুলো কটু মনে হতে পারে। তাতে কি?
    আমি যদি তোমাকে এতো ভালোবাসতে পারি, তোমার জন্যে লিখতে পারি তাহলে কি তোমার বৃহত্তর কল্যাণের জন্যে তোমাকে কয়েকটা কটু কথা বলার অধিকার রাখিনা বল?
    আর একটা প্রবাদই তো আছে যে, “শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে”।

    ক)

    একটু চিন্তা করে দেখতো তোমাকে অনার্স পাস করতে হলে ছোটবেলা থেকে অনার্স পর্যন্ত কমপক্ষে ১৩৫ টি বই পড়তে হয়(প্রতি বিষয়ের জন্যে কমপক্ষে একটি করে বই ধরে কিন্তু অনেক সময় আমদেরকে একটা বিষয়ের জন্যে তিনটা থেকে চারটা পর্যন্ত বইপরতে হয়)।
    কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে এই কমপক্ষে ১৩৫ তার মধ্যেও তোমার জীবনের জন্যে সবচেয়ে অত্যাবশ্যকীয় একটা বই(আল-কোরআন)থাকে না।
    তোমার এই পৄথিবীতে একটা চাকরীর জন্যে শত শত আজেবাজে বই পড়ার সময় হয় কিন্তু আল-কোরআন পড়ার সময় হয় না।
    তার পরেও তুমি নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দাও!!
    আল্লাহর কাছে মুক্তির আশা করো!!।
    আমার মনে হয় আমাদের নিজেদের একটু লজ্জিত হওয়া উচিত।

    খ)

    একবার চিন্তা করতো সাময়িক কিছু বিনোদনের জন্যে তুমি হাজার হাজার টাকা খরচ করে হুমায়ূন আহমেদের বই, জাফর ইকবালের বই, বিভিন্ন মুভি ডিস্ক এবং আরও কত কি কিনতে পারো কিন্তু মাত্র হাজার বারোশ টাকা খরচকরে ইসলাম বুঝার জন্যে একটা কোরআনের তাফসীর বা কয়েকটা ইসলামিক বই কিনতে পারোনা।
    তা পারবে কেন? তুমি তো আধুনিক ছেলে বা মেয়ে!!
    তোমার কি কোরআনের তাফসীর আর ইসলামিক বই পড়ার সময় আছে? তোমার সময় আছে একরাতে দুই তিনটা মুভি দেখে শেষ করার!!
    তোমার সময় আছে টিএসসিতে বন্ধু বান্ধবীদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দেয়ার!!
    তোমার সময় আছে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে পার্কে বসে নিভৃতে আড্ডা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করার!!
    তোমার সময় আছে গার্লফ্রেন্ডের সাথে সারারাত জেগে ফোনালাপ করার!!
    তোমার কি ইসলাম নিয়ে, কোরআন- হাদিস নিয়ে আলোচনা করার সময় আছে? তা থাকবে কেন ? তোমার সময়গুলো হচ্ছে এক থা টাইগার, ডার্টি পিকচার আর বলিউডের কোন মুভিটা কত হিট হয়েছে তা নিয়ে বন্ধুদের সাথে আলোচনায় হারিয়ে যাওয়ার।

    কোন মুভি প্রথম দিনেই কত মিলিয়ন ডলার আয় করছে তা একেবারে তোমার নখদর্পণে।
    স্প্যানিশ লীগে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে কে কয়টা গোল করছে সব তোমার মুখস্ত।
    আগামী বছর কে ব্যালন ডি জিতবে তাও বলে দিতে পারবে।

    পৃথিবীর সব বিষয়ের জ্ঞান তুমি রাখো। তুমি সবই বলে দিতে পারবে। বলতে পারবে না শুধু পবিত্র কোরআনে কয়টা সূরা আছে, সিহাহ সিত্তাহ মানে কী।
    সত্যি তোমার জন্যে আমার করুণা হয়, তোমার জন্যে আমার লজ্জা হয়, তোমার জন্যে আমি বিব্রত!!!

    তারপরেও তোমাকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি, অনেক অনেক পছন্দ করি। আর তাই তোমাকে এই কথাগুলো বললাম যেন তোমার চেতনা ফিরে আসে, যেন তোমার ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা সত্যিকারের মানুষটা জেগে ওঠে।

    গ)

    হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে, সস্তা প্রেমের সিনেমা দেখে, সস্তা প্রেমের উপন্যাস পড়ে তোমার চোখে জল এসে যায় কিন্তু নিজের শত শত ভুল আর পাপের জন্যে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে একফোঁটা চোখের জল ফেলার সময় তোমার হয় না।
    আর দাঁড়ালেও সেসময় চোখের সমস্ত জল যেন কর্পূরের মত বাষ্প হয়ে উড়ে যায়!!
    এভাবে আর কতদিন বল? এখনি কি তোমার চেতনা হবে না নাকি আল কোরআনের ওই আয়াতের মত হবে তোমার অবস্থাঃ

    “ দুনিয়ায় বেশী বেশী এবং একে অপরের থেকে বেশী পাওয়ার মোহ তোমাদেরকে গাফলতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।এমনকি তোমরা (এই চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে) কবর পর্যন্ত পৌঁছে যাও।”
    – (সুরা আত তাকাসুরঃ ১-২)

    বল, আর কবে তোমার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে? শেষ বয়সে? কিন্তু তুমি যে আর এক মুহূর্ত পরে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে এই নিশ্চায়তা তোমাকে কে দিল?

    ৫)

    শুরু হোক নতুন জীবন, নতুন অধ্যায়।অতীতের ভুল ভ্রান্তির জন্যে পরম করুনাময় আল্লাহর কাছে তওবা করে,ক্ষমা চেয়ে আজ থেকে শুরু হোক নতুন জীবন।
    শুরু হোক নতুন করে চলার পথ, যে পথ শুধুই আলোয় ভরা, যে পথ শুধুই সাফল্যের, যে পথে ব্যর্থতার কোন হিসেব নেই, আল কোরআনই হবে যে পথের একমাত্র আলোকবর্তিকা।

    আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেনঃ

    “হে ঈমানদারগণ তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তওবা করো, তাহলেই তোমরা কল্যান লাভ করতে পারবে।”
    – (সুরা আন নূরঃ ৩১)

    “হে ঈমানদগন তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করো।”
    – (সুরা আত তাহরীমঃ ৮)

    রাসুল(সাঃ) বলেনঃ

    “আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় সেই ব্যক্তির চেয়েও বেশি খুশি হন যার খাবার ও পানীয় সামগ্রী নিয়ে সাওয়ারী উটটি হঠাৎ গভীর মরুভূমিতে হারিয়ে গেল।
    অনেক খোঁজাখুজির পর হতাশ হয়ে লোকটি একটি গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়ল। এরূপ অবস্থায় হঠাৎ সে উটটিকে নিজের কাছে দাঁড়ানো দেখতে পেল।
    সেউটের লাগাম ধরে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বলতে লাগলঃ হে আল্লাহ্‌ তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার প্রভু!!
    সে অতিশয় আনন্দেই এই ভুল করে বসল।”
    – (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

    “আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন আমি রাসুল (সাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ
    আল্লাহর কসম! আমি একদিনে সত্তর বারের চেয়েও বেশি তওবা করি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।”
    -(সহীহ আলবুখারী)

    শেষ কথাঃ

    এই সুন্দর পৃথিবীতে কে একটু সুন্দরভাবে বাঁচতে না চায়।
    আমরা সবাই চাই কারো কাছে হাত না পেতে একটু স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচতে।
    আমরা সবাই চাই পৃথিবীতে আমাদের ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-সম্মান থাকুক।
    তবে মনে রাখতে হবে তা যেন আখিরাতের সাফল্যের চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে, আখিরাতকে বিনষ্ট করে নয়।
    আর প্রাণপণ চেষ্টাকরলেই কি অঢেল ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-সম্মান অর্জন করা যায়?

    আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেনঃ

    বলোঃহে আল্লাহ! তুমিই বিশ্ব-জাহানের মালিক! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করো এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা ছিনিয়ে নাও৷
    যাকে ইচ্ছা মর্যাদা ও ইজ্জত দান করো এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্চহিত ও অপমানিত করো৷
    সমস্ত কল্যাণ তোমরা হাতেই নিহিত ৷ নিসন্দেহে তুমি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান।
    – (সুরা আল ইমরানঃ ২৬)

    আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে ইসলাম, কোরআন-হাদিস বুঝার তৌফিক দান করুন।আমীন।

    image

    (লেখক : তানভীর আহমাদ আরজেল
    লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে)

    একটি বাড়ি ও নির্ঝরিণীর স্বপ্ন

    মাঝে মাঝে বিকেলে আসরের নামায পড়েই বা তার কিছু পর হাঁটতে বের হই।
    বাড়ির পাশের ছোট যমুনা নদীটিতে পানি এসেছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার প্রবাহমাত্রাটা একটু বেশি। তাই হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই নদীর পাড়ে।
    সমবয়সী, কিছু বড় বা ছোট অনেকের সাথেই দেখা হয়, কথা হয়। কথা এগোতে থাকে বিভিন্নমুখি।
    কারও চাকুরিক্ষেত্রের খবর, কারও নতুন চাকুরি সন্ধানের খবর, কারও সংসার আর কারও বা সংসার করতে যাওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার খবর।
    কারও মুখে প্রত্যাশা, কারও বা হতাশা। কেউ আবার কথা বলতে পছন্দ করেন রাজনীতি বিষয়ক। মানব মনের মুক্ত চিন্তার যেন ফোয়ারা ছুটে।

    ব্যক্তিগতভাবে আমি কথা বলার চাইতে শুনতেই পছন্দ করি। মন দিয়ে শুনতে থাকি কত মানুষের কত রকম আবেগ, অনুভূতি আর হরেক রকমের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটতে থাকে।
    এরই মাঝে হঠাৎ দুই একটা বিষয়ে কথা বলি নয়ত নদীর পাড়ে বসে থাকি চুপচাপ। কখনও বা স্রোতস্বিনীর কূল কূল ধ্বনি আমায় ভাবালুতায় মিশিয়ে দেয়, যেন সম্মোহিত করে ফেলে।
    নিজের স্বপ্ন আর কল্পনার খেয়াপালে ভেসে যেতে থাকি দূর বহুদূর; যেথা শুধু আমি আর আমি। যে কল্পনায় শুধু নিজের একাকীত্ব।
    যে ভাবনাতে ভাগ নেই দুনিয়ার কারও। শুধু আমি আর আমার মনিব, আমার প্রভু আল্লাহ।

    অজানা এক ভাললাগায় মিশে যায় হৃদয় আর মন। বাস্তবতার ব্যস্ত কোলাহল থেকে ছুটি মিলে।
    নদীর পানি, তার সব বাধা ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মত আমার মনও এগোতে থাকে সব বাধা পেরিয়ে অনন্ত অসীম জীবনের সুমধুর সুখের টানে, শান্তি সুখের আবাসনে।
    ভাবতে থাকি আমারও একটা ছোট্ট বাড়ি হবে, গাছপালা ঘেরা সুন্দর সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা থাকবে চারিপাশ। পাখপাখালির সুমধুর গানে হৃদয়-মন হবে পুলকিত।
    এরই পাশ দিয়ে থাকবে একটা নির্ঝরিনী। স্বচ্ছ পানির ধারায় যেথা চোখ জুড়াবে, যার পানি তেষ্টা মিটাবে আর সেথা অবগাহন করে আমি হব শান্ত, হব প্রশান্ত আত্মা।

    কতই না সুন্দর, কতই না মধুর জীবন। অজস্র ব্যবহারেও এতটুকু কমতি হবেনা, একটুও ফুরাবেনা।

    যেমন মহান আল্লাহ বলেন-

    কিন্তু যারা ভয় করে নিজেদের পালনকর্তাকে তাদের জন্যে রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে প্রস্রবণ।
    তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সদা আপ্যায়ন চলতে থাকবে। আর যা আল্লাহর নিকট রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্যে একান্তই উত্তম।
    (সুরা আল ইমরানঃ আয়াত-১৯৮)

    যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়।
    তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা।
    তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে।
    আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।
    (সূরাআল মুজাদিলাঃ আয়াত-২২)

    এছাড়াও আরও কত জায়গায় রাহমানুর রাহীম আল্লাহ সেই বাড়ির কথা বলেছেন, বলেছেন নির্ঝরিনীর কথা-
    সূরা আল ইমরান-১৯৫, সুরা আন নিসা-১৩, সূরা আল আনকাবূত-৫৮, সূরা আল ফাতাহ-৫, সূরা আল কাহাফ-৩১, সূরা মুহাম্মদ-১২, সূরা আত তাগ্বাবূন-৯, সূরা আত তালাক্ব-১১, সূরা বায়্যিনাহ-৮, সূরা আত তাহরিম-৮

    ইয়া রাহমানুর রাহীম, তুমি আমাদের কবুল কর। আমীন।

    [মূল লেখক : জনাব আবু নাসের; প্রথম প্রকাশিত হয় এখানে। ]